Home Bangla Blog মহানায়ক উত্তম কুমার।

মহানায়ক উত্তম কুমার।

203
মহানায়ক উত্তম কুমার
———————————
        ।তৃতীয়পর্ব।
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উত্তম-সুচিত্রা জুটিকে এখনো শ্রেষ্ঠ জুটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একসময় কলকাতার চলচ্চিত্র পাড়ায় উত্তম-সুচিত্রা জুটি ছাড়া সে সময় কোনো ছবি ‘হিট’ হবে –  এমন ভাবনা ছিল নির্মাতাদের কল্পনার বাইরে। এক পর্যায়ে সাধারণ মানুষ ভাবতে শুরু করে, চলচ্চিত্রের মতো বাস্তবেও হয়তো তারা একই সম্পর্ক ধারণ করেন। 

১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে একটি পোস্টার ঝড় তোলে উত্তম-সুচিত্রার সংসার জীবনে। সুচিত্রা সেনের সই দেয়া ওই পোস্টারে লেখা ছিল ‘আমাদের প্রণয়ের সাক্ষী হলো ‘অগ্নিপরীক্ষা’। 

ভারতীয় পত্রিকাগুলোর খবর, সেই পোস্টার দেখে উত্তমকুমারের স্ত্রী গৌরি দেবী ভেঙে পড়েন। অন্যদিকে সুচিত্রা সেনকেও সন্দেহ করতে শুরু করেন স্বামী দিবানাথ এবং অভিনয় ছেড়ে দিতেও চাপ দেন। কিন্তু অন্তত ১০টি ছবিতে এই জুটি চুক্তিবদ্ধ ছিলেন বলে, অভিনয় ছাড়া সম্ভব হয় নি। ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে উত্তম কুমার তাঁর প্রযোজিত ‘হারানো সুর’ ছবিতে নায়িকা হওয়ার প্রস্তাব দিলে সুচিত্রা সেন বলেছিলেন, ‘তোমার জন্য সব ছবির ডেট ক্যান্সেল করব’। 
একদিন সুচিত্রা সেনের বালিগঞ্জের বাড়িতে এক পার্টিতে দিবানাথের শারীরিক আক্রমণের মুখেও পড়তে হয় উত্তম কুমারকে। এরপর থেকেই দিবানাথের সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে থাকে সুচিত্রা সেনের। এক সময় তিনি শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে আলাদা থাকতে শুরু করেন দক্ষিণ কলকাতার নিউ আলিপুরে। তাঁর অভিনীত সর্বশেষ ছবি ‘প্রণয় পাশা’ মুক্তি পায় ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে। এরপর আকস্মিকভাবেই চলে যান লোকচক্ষুর অন্তরালে। এরপর প্রথম সুচিত্রা সেন আড়াল ছেড়ে বাইরে আসেন উত্তমকুমারের মৃত্যুর পর। মাঝরাত পর্যন্ত বসে ছিলেন তাঁর মরদেহের পাশে। উত্তম কুমার ২৯টি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন সুচিত্রা সেনের বিপরীতে।
চিরকালের জুটি উত্তম-সুচিত্রা বিষয়ে আরো কিছু তথ‍্য জানা যাক।
উত্তম-সুচিত্রা জুটির জন্ম দিয়েছিল যে ছবি, সেই ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এ সুচিত্রা সেনের কাজ করারই কথা ছিল না। রমলা চরিত্রের জন্য আগে থেকেই মালা সিনহাকে ঠিক করে রেখেছিলেন পরিচালক নির্মল দে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়ান মালা সিনহা। তাড়াহুড়োয় প্রতিষ্ঠিত কাউকে না পেয়ে শেষে উঠতি নায়িকা সুচিত্রাকেই নিতে বাধ্য হলেন নির্মল দে। ইন্ডাস্ট্রিতে তখন একেবারেই নতুন মুখ এই সুচিত্রা সেন; ঝুলিতে মাত্র দু’টি ছবি, যার প্রথমটি মুক্তিই পায়নি। ছবির সংখ্যার বিচারে উত্তমকুমারের অবস্থা সুচিত্রার চেয়ে ভালো, তবে জনপ্রিয়তার বিচারে খুবই সঙ্গীন। তখন পর্যন্ত মুক্তি পাওয়া ৯টি ছবির আটটিই সুপার-ডুপার ফ্লপ, একটির কাজ শেষই হয়নি, হিট মোটে একটি ছবি। ফলে ইন্ডাস্ট্রিতে টিকবেন কি না তার অনেকটাই ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এর সাফল্যের ওপর নির্ভরশীল। তবে ভরসার জায়গাও ছিল – তখন পর্যন্ত উত্তমকুমারের একমাত্র হিট ছবি ‘বসু পরিবার’-এর পরিচালক ছিলেন এই নির্মল দে। আর সিনেমাটিতে ছিলেন তুলসী চক্রবর্তী, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, মলিনা দেবীর মতো অভিনয়শিল্পী। ১৯৫৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পেল ‘সাড়ে চুয়াত্তর’। জন্ম নিল বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে সফল ও স্থায়ী এক জুটি। ‘পূর্ববর্তী ছবিগুলোর ব্যর্থতার দায় আমার না’ – নানা জনের কাছে বলা উত্তমকুমারের এই দাবির সত্যতাও প্রমাণ করল এ ছবির সাফল্য। উত্তমকুমার বরাবরই বলে আসছিলেন, নতুন যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নায়িকাও আনতে হবে নতুন। কিন্তু তাঁর বিপরীতে দেওয়া হচ্ছিল সন্ধ্যারানী প্রমুখ চল্লিশের দশকের নায়িকা। ফলে দর্শক ছবি নিচ্ছিল না। আসলেই সাড়ে চুয়াত্তর-এ নতুন নায়িকা সুচিত্রা সেনকে লুফে নিল দর্শক। তবে উত্তম-সুচিত্রার যে সিরিয়াস রোমান্টিক রূপ সাধারণ দর্শক সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে, তার জন্য অপেক্ষা করতে হলো আরো দেড় বছর ও চারটি ছবি। ১৯৫৪ সালে মুক্তি পেল ‘অগ্নিপরীক্ষা’। জনপ্রিয়তার সব রেকর্ড ভেঙে দিল উত্তম-সুচিত্রার এই ছবি। তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয় নি এই জুটির। এক অনন্ত পথে যাত্রা করলেন তাঁরা। ‘সপ্তপদী’-র সেই বিখ্যাত গানের মতোই মনে হচ্ছিল, আসলেই বুঝি কোনোদিন শেষ হবে না এই পথ। তবে সব ভালোরই শেষ আছে, নইলে ভালো যে আর ভালো থাকে না। ১৯৫৩ সালে যে উত্তম-সুচিত্রা জুটির যাত্রা শুরু হয়েছিল, ১৯৭৫ সালে ‘প্রিয় বান্ধবী’-র মাধ্যমে তার সমাপ্তি ঘটলো। পরে হয়তো আবার শুরু হতে পারত এ যাত্রা। কিন্তু তার আগেই চিরতরে বিদায় নিলেন উত্তম কুমার, অন্তরালে চলে গেলেন সুচিত্রা সেন। ২২ বছরে মুক্তি পেয়েছে এ জুটির ২৯টি চলচ্চিত্র। তার মধ্যে আছে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘একটি রাত’, ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘গৃহদাহ’, ‘কমললতা’র মতো ছায়াছবি।
মহানায়ক উত্তমকুমারের মজার কিছু তথ্য জানা যাক। ব্যক্তিগত জীবনে সাহিত্যিক ‘বনফুল'(বলাইচা়ঁদ মুখোপাধ্যায়) ছিলেন উত্তমকুমারের ভায়রা। ‘ঘরে বাইরে’-র সন্দ্বীপ চরিত্রটির জন্য উত্তম কুমারকে নিতে চেয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়।
উত্তম কুমারের জীবন অবলম্বনে তৈরি হয়েছে তিনটি উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি : সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’, অজয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘স্বপন’ এবং বুদ্ধদেব বসুর ‘পাতাল থেকে আলাপ’। সুচিত্রা সেন নয় ; নায়িকাদের মধ্যে সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি ছবি করেছেন উত্তম কুমার – ৩২টি, বিপরীতে সুচিত্রা সেনের সঙ্গে ২৯টি। প্রেমিকা ও পরবর্তী সময়ে জীবন সঙ্গী সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে উত্তমের প্রথম ছবি ‘বসু পরিবার’-এ তাঁদের সম্পর্ক কী ছিল, জানেন? ভাই-বোন। 
ভবানীপুর সুইমিং অ্যাসোসিয়েশনের টানা তিনবারের চ্যাম্পিয়ন ছিলেন উত্তমকুমার।
সম্পাদনা
কৃত্তিবাস ওঝা ও অবন্তিকা
(আগামী পর্বে সমাপ‍্য)
%d bloggers like this: