‘দেবভাষা’ সংস্কৃত ‘মৃত’ নয়, অজস্র মানুষের মুখের ভাষা……………..

Spread the love

মানিক রক্ষিত ||

বিশ্বের
অন্যতম প্রাচীন ও সমৃদ্ধ ভাষা সংস্কৃত। প্রাচীনতম অথচ বিজ্ঞানসম্মত
নির্ভুল ব্যাকরণ রয়েছে একমাত্র সংস্কৃত ভাষাতেই। ভারতীয় প্রাচীন সকল
ধর্মগ্রন্থ ও সাহিত্যরাজি রচিত হয়েছে এই পবিত্র ভাষাতে। এতটা সুললিত ভাষা
মানবসভ্যতার ইতিহাসে অদ্বিতীয়। তাই একে বলা হয় ‘দেবভাষা’ অর্থাৎ দেবতাদের
মুখের ভাষা।ভারতীয় সংস্কৃতিবিদ্বেষী অনেকেই প্রচার করেন সংস্কৃত একটি মৃত ভাষা।
কিন্তু মজার বিষয়

হলো, ভারতে সংস্কৃত ভাষাভাষীর সংখ্যা এখনো প্রায় এক লাখের
কাছে। শুধু ভারতে নয়, পাশ্চাত্যেও সংস্কৃত ভাষার জনপ্রিয়তা দিনদিন বাড়ছে।
বিশ্বব্যাপী সংস্কৃত ভাষার প্রচার, প্রসার ও জনপ্রিয়তা দিনদিন বৃদ্ধি
পাচ্ছে। বিশেষ করে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর কয়েক লক্ষ শব্দের ভাণ্ডার
এসেছে এই প্রাচীন সংস্কৃত ভাষা থেকে। তাই শিকড়ের সন্ধানে বহুদেশের বহু
গবেষক হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন সংস্কৃত শেখার জন্য। দৃষ্টান্তস্বরূপ জার্মানির কথা
বলা যেতে পারে। বর্তমানে জার্মানির ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রায় ১২০০টি
স্কুলে সংস্কৃত পড়ানো হচ্ছে। আর সেটা পড়ানো হয় ঠিক যেন বৈদিক যুগের একটা
আবহে। তাই বলা হয় যদি কোন দুর্যোগে ভারত থেকে সংস্কৃত ভাষা হারিয়ে যায় তবে
জার্মানিই হবে সংস্কৃত ভাষার ভবিষ্যত ধারক ও বাহক।

জার্মানির দৃষ্টিতে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যভাণ্ডার এক রত্নসাগর। সেখানে
মন্থন করে তারা মানবজাতির শিকড়কে জানতে চান, অতীতের
জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে জানতে চান। তবে দেরিতে
হলেও ঠিক এই গুরুত্বটাই সম্প্রতি ভারতের মানবসম্পদ মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি
উপলব্ধি করে লোকসভায় ঘোষণা দিয়েছেন যে, ভারতের প্রতিটি আইআইটিতে সংস্কৃত
ভাষা ও সাহিত্য পড়তে হবে যাতে ভারতের প্রযুক্তিবিদগণ সংস্কৃত ভাষায় বিজ্ঞান
ও প্রযুক্তি চর্চা ও অধিকতর গবেষণা করতে পারেন।

ভারতে পবিত্র ‘দেবভাষা’ সংস্কৃত শিক্ষার প্রসারে বেশ আন্তরিক নরেন্দ্র
মোদীর কেন্দ্রীয় সরকার। সম্প্রতি তিনটি সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষণা
দিয়েছে মোদি সরকার। গতবছর ভারত সরকারের পরিচালিত ৫শ’ কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে
জার্মান ভাষাকে বাদ দিয়ে সংস্কৃতকে তৃতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া
হয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগকে ভারতবর্ষের সকল সংস্কৃতিপ্রেমী সুধীজন সাধুবাদ
জানিয়েছেন। বর্তমানে নতুন তিনটিসহ ভারতে মোট ১৫টি সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়
রয়েছে। এগুলো হলো:

১। রাষ্ট্রীয় সংস্কৃত বিদ্যাপীঠ, তিরুপতি (অন্ধ্রপ্রদেশ)

২। রাষ্ট্রীয় সংস্কৃত সংস্থান (প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়), নয়াদিল্লী

৩। শ্রীভেঙ্কটেশ্বর বৈদিক ইউনিভার্সিটি, তিরুমালা, তিরুপতি (অন্ধ্রপ্রদেশ)

৪। কামেশ্বর সিং দরভঙ্গ সংস্কৃত ইউনিভার্সিটি, কামেশ্বর নগর, দরভঙ্গ (বিহার)

৫। শ্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী রাষ্ট্রী সংস্কৃত বিদ্যাপীঠ, কাট্বারিয়া সরই, নয়াদিল্লী

৬। শ্রী শংকরাচার্য ইউনিভার্সিটি অব সংস্কৃত, কালাডি, এরনাকুলম

৭। শ্রী জগন্নাথ সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়, শ্রীবিহার, পুরী

৮।  জগদ্গুরু রামানন্দাচার্য রাজস্থান সংস্কৃত ইউনিভার্সিটি

৯। সম্পূর্ণানন্দ সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়, বারানসি

১০। সোমনাথ সংস্কৃত ইউনিভার্সিটি, সোমনাথ, জুনাগড় (গুজরাট)

১১। উত্তরাখণ্ড সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়, হরিদ্বার

১২। কবিকুলগুরু কালীদাস সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়, রামটেক, নাগপুর

১৩। মহর্ষি পাণিনি সংস্কৃত ইবম বেদিক ইউনিভার্সিটি, উজ্জইন (মধ্যপ্রদেশ)

১৪। কর্ণাটক সংস্কৃত ইউনিভার্সিটি, চমরেন্দ্র সংস্কৃত মহাপাঠশালা, বাঙ্গালোর (কর্ণাটক)

১৫। কুমার ভাস্কর বর্মা সংস্কৃত অ্যান্ড অ্যান্সিয়েন্ট স্টাডিস ইউনিভার্সিটি, নলবাড়ি (আসাম)

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভারতের শিক্ষা
মন্ত্রণালয় এই প্রাচীন পবিত্র ভাষাটিকে জনপ্রিয় করার চেষ্টা চালিয়ে আসছেন।
তবে তিনি ভারতের সংবিধানের বাইরে নতুন কিছু করছেন না। ভারতের সংবিধানে
অষ্টম তফসিলে ভারতের অন্যতম অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে সংস্কৃত ভাষাকে স্বীকৃতি
দেওয়া হয়েছে।

এবার দেখা যাক, সংস্কৃত ভাষায় কেউ কি আজও কথা বলেন? এটা কি আদৌ মৌখিক ভাষা হতে পারে? এর উত্তর সন্ধানে জানা যায় বিস্ময়কর তথ্য।

ভারতের কর্ণাটক প্রদেশের শিবমগ্গা শহরের নিকটবর্তী মাত্তুর  ও
হোসাল্লী নামক গ্রামের শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকল মানুষ এখনও সংস্কৃত ভাষায় কথা
বলেন। সেখানে কৃষক, গৃহিনী, ছাত্র-ছাত্রী, পেশাজীবী সকলের দৈনন্দিন জীবনের
ব্যবহারিক ভাষা সংস্কৃত। অত্র গ্রামের প্রায় ৫০০০ মানুষ এখন সংস্কৃত ভাষায়
কথা বলে। শুধু ব্রাহ্মণ নয়, গ্রামের সব সম্প্রদায়ের সব পেশার মানুষ ঝরঝরে
সংস্কৃত বলেন সেখানে। বাদ যান না মুসলিমরাও। তাঁরাও আপন করে নিয়েছেন
দেবভাষাকে। গ্রামের ঘরে ঘরে শিশুরা জন্ম থেকেই সংস্কৃত শেখে তাদের মায়ের
কাছে। পাঠশালাতে পাঠ শুরু হয় বৈদিক স্তোত্র পাঠ দিয়ে। এখানে সব স্কুলে
সংস্কৃত প্রথম ভাষা।

এছাড়াও মধ্যপ্রদেশের ঝিরি, রঘুওয়ার, নরসিংহপুর জেলায় মোহাদ, রাজগড়
জেলার পটিয়াতে, রাজস্থানের বুন্দি জেলার কাপেরনে, রাজস্থানের বাঁশওয়ারা
জেলায় খাডা এবং গানোডায়, উত্তর প্রদেশের বাগপাট জেলায় বাওয়ালিতে, ওড়িশার
কেন্দুঝড় জেলায় শ্যামসুন্দরপুর গ্রাম সহ আরও কিছু অঞ্চলে প্রায় ১৪ হাজার
১৩৫ জন মানুষের মাতৃভাষা সংস্কৃত (২০০১ সালের হিসাব)। ২০১২ সালের অক্টোবর
থেকে উত্তরাখণ্ড রাজ্যে দ্বিতীয় সরকারি ভাষা হিসাবে সংস্কৃত ভাষা
নির্দিষ্ট হয়েছে। সেখানে সংস্কৃত ভাষাভাষী সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। ১৯৯১
সালের গণশুমারী অনুযায়ী ভারতে ৪৯,৭৩৬ জন ব্যক্তি অনর্গল সংস্কৃতে কথা বলতে
পারতেন। বর্তমানে এই সংখ্যাটা আনুমানিক প্রায় এক লাখ।

এ কথা সত্য যে বর্তমানে ভারতের মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশেরও কম মানুষ
সংস্কৃতে কথা বলেন। তবে দিন দিন এই দেবভাষা জনপ্রিয় হচ্ছে। ভারতবাসী তাঁদের
হাজার বছরের প্রাচীনতম, বিজ্ঞানসম্মত ও সমৃদ্ধতম পবিত্র ‘দেবভাষা’ সংস্কৃত
ভাষার প্রতি টান বোধ করছে। তাই সংস্কৃত ভাষাভাষীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে
ছাড়া কমছে না।