Home Bangla Blog বিশ্বের বৃহত্তম গণহত্যার নীরব সাক্ষী চুকনগরঃ….

বিশ্বের বৃহত্তম গণহত্যার নীরব সাক্ষী চুকনগরঃ….

211

বিশ্বের বৃহত্তম গণহত্যার নীরব সাক্ষী চুকনগরঃ….

“এ দৃশ্য জীবনে কোনোদিন দেখি নাই, গুলি খেয়ে যে রক্তের স্রোত বয়ে যায় শুনেছি, সেই রক্তের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। আর মানুষ, কেউ হাত নাড়ছে, কেউ মাথা নাড়ছে, কেউ চোখ মেলছে, এরকম করছে। … আমি যখন খেয়া পার হই, তখন জনৈক মহিলা চিৎকার করে কাঁদছে। আমি বলছি, মা কানছো কেন? তা বলল, আমার স্বামীকে এ রকম বুকে জড়ায়ে ধরেছিলাম, ওরা এসে আমার স্বামীকে ছাড়ায়ে নিয়ে স্বামীর বুকে রোল ধরে গুলি করেছে। ছোট ছোট বাচ্চা ঐরম মাটিতে পড়ে থাকা মায়ের বুকের উপরে উঠে দুধ খাচ্ছে, আর মা মরে গেছে।” – বলছিলেন চুকনগর গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী বটিয়াঘাটার অশীতিপর পূর্ণচন্দ্র রায়। চুকনগর হত্যাকান্ডে তিনি সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান এবং হত্যাকান্ডের শিকার অন্য স্বজনদের যখন খুঁজে ফিরছিলেন, সেই সময়ের ভয়াল স্মৃতি আজও তাকে তাড়িত করে। অথবা বটিয়াঘাটার ছয়ঘরিয়া গ্রামের সরলা মন্ডল। সেই নৃশংস হত্যাকান্ড স্মৃতির বর্ণনাকালে তিনি বলছিলেন, ‘দুইজন মানুষ আইসে মাইরে গেল, পরপর আমার স্বামী গেল, আমার ছেলেটা গেল, আমার ভাইপোগুলান গেল, তখন আমার কী অবস্থা, আমি ওদের বললাম, তোরা আমাদের নিয়ে যা, তাদের তো মাইরে থুয়ে গেলে, এখন আমরা কী করব। আমরা বুক পাতিছি। আমাকে একটা গুলি করে যাও, আমরাও তাদের সাথে যাই।” এরপর সরলা বিলাপ করতে করতে এক সময় স্বামী আর একমাত্র পুত্রের মৃতদেহ ফেলে রেখে বেঁচে যাওয়া অন্যদের সাথে বেরিয়ে পড়েন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। গন্তব্য সীমান্তের ওপারে ভারত।

উপরোল্লিখিত দুটি মর্মান্তিক বর্ণনা চুকনগর গণহত্যার খন্ডচিত্র মাত্র। প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীর ইতিহাসে বর্বরোচিত যেসব গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, এর মধ্যে অন্যতম একটি হল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন খুলনা জেলার পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত চুকনগরের গণহত্যা।

১৯৭১ সালের ২০ মে সংঘটিত এই গণহত্যা ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সবচাইতে বড় ও নৃশংসতম গণহত্যা। এই গণহত্যায় ছয় ঘণ্টায় ১০ থেকে ১২ হাজার নিরীহ মানুষ নিহত হন। অনেকের মতে, সেই গণহত্যায় নিহতের সংখ্যা ১২ হাজারেরও বেশি। যাদের মধ্যে প্রায় ষোলো আনাই ছিলেন সংখ্যালঘু হিন্দু!

খুলনা, যশোর ও সাতক্ষীরা জেলার মিলনস্থলে চুকনগর বাজার। এখান থেকে ভারত সীমান্ত মাত্র ৩০/৩৫ কিলোমিটার দূরত্বে। এই বাজারের বুক চিরে যশোর-সাতক্ষীরা মহাসড়ক এবং খুলনা সড়ক তখনও পাকা হয়নি। উত্তর পাশ দিয়ে প্রবহমান খরস্রোতা ভদ্রা নদী। সেদিন পিরোজপুর, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ ও খুলনার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার সংখ্যালঘু পরিবার পাকিস্তানি হানাদার এবং তাদের দোসরদের হাত থেকে বাঁচার জন্য প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে এই চুকনগর বাজারে এসে জড়ো হলে তারা স্থানীয় পাকিস্তানি দোসরদের সহায়তায় হানাদার বাহিনীর হাতে আক্রান্ত হন।

২০ মের আগে থেকে খুলনা ও বাগেরহাট জেলার বিভিন্ন উপজেলার হাজার হাজার মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যাওয়ার উদ্দেশে নৌপথে ও হেঁটে আসতে থাকেন চুকনগরে। এই স্থানটিকে তারা ট্রানজিট রুট হিসেবে বেছে নেন। জন্মভূমির মায়া পরিত্যাগ করে জীবন বাঁচানোর তাগিদে সহায়-সম্বলহীন এই মানুষেরা এসেছিলেন বৃহত্তর খুলনার রূপসা, তেরখাদা, বাগেরহাট, ফকিরহাট, মোল্লারহাট, চিতলমারী, রামপাল, মোরেলগঞ্জ, কচুয়া, শরণখোলা, মংলা, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, চালনাসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। মানুষের কাফেলায় সেদিন কোলের শিশু থেকে অশীতিপর বৃদ্ধও ছিলেন। বেশিরভাগ লোকজনই নৌকায় করে চুকনগরে এসেছিলেন। অনেকে সড়কপথে বাসে ও ট্রাকে করে এসেছিলেন যশোর থেকে। ২০ মে সকাল পর্যন্ত আগত মানুষের সংখ্যা প্রায় লাখে পেঁছায়।

বস্তুত ভদ্রা, কাজীবাছা, খড়িয়া, ঘ্যাংরাইল প্রভৃতি নদী ও শাখানদী পথে এবং কাঁচা রাস্তায় দাকোপ, বটিয়াঘাটা, রামপাল, তেরখাদা ও ফকিরহাট থেকে খুলনা-ডুমুরিয়া হয়ে চুকনগর ছিল সে সময়কার বিবেচনায় ভারতমুখী সর্বাধিক নিরাপদ রুট। অসংখ্য নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন ও সংকীর্ণ কাঁচা মাটির এই পথে আর্মি কনভয় চলাচল সম্ভব ছিল না। ফলে সীমান্তমুখী লোকজন এই পথ বেছে নিতেন। আটালিয়া ইউনিয়নের উক্ত এলাকাটি ছিল খুলনা, যশোর ও সাতক্ষীরার মিলনবিন্দু এবং সেই আমলের সম্মৃদ্ধ ব্যবসাকেন্দ্র। ভারতের পথে শ্রান্ত-ক্লান্ত লোকজন বিশ্রাম, সীমান্ত পর্যন্ত পরবর্তী পথের অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ খবর নেয়া এবং গাইড ও যানবাহনের সন্ধানে এখানে থামতেন। কেননা, এই পথের বিভিন্ন স্থানে যেমন আর্মি কনভয় চলাচল করতো, তেমনই ছিল দালাল লুটেরাদের ভয়। এখান থেকে ভারতে যাওয়ার মূল রুট ছিল মঙ্গলকোট-সরসকাটি-কলারোয়া হয়ে হাঁটা পথে। ফলে, নৌকা এবং বিভিন্ন জিনিসপত্র নামমাত্র মূল্যে বেঁচে দিয়ে তাদের হালকা হতে হতো। চুকনগরে মানুষের কাফেলা আগে থেকেই ছিল। কিন্তু মে’র তৃতীয় সপ্তাহে দাকোপ, বটিয়াঘাটা, রামপাল, ডুমুরিয়া প্রভৃতি এলাকা প্রায় একযোগে আক্রান্ত হওয়ায় গ্রামের পর গ্রাম উজাড় করে লোকজন চলে আসতে থাকেন। তাদের অনেকেই এসেছিলেন সহায়-সম্বল হারিয়ে। বটিয়াঘাটার কাতিয়ানাংলা গ্রামের একটি একান্নবর্তী পরিবারের তিনজন বিধবা করবী রায়, পুষ্পরানী রায় ও সরস্বতী রায়ের ভাষ্য থেকে জানা যায়, সেই পরিবারের দশ বিঘা জমি মাত্র ১ টাকায় বিক্রি করে তারা পাড়ি জমান ভারতের উদ্দেশে। করবী রায়ের স্বামী নরেন রায়, পুষ্পরানী রায়ের স্বামী হরিভক্ত রায় এবং সরস্বতী রায়ের স্বামী পবন রায় চুকনগরের এই গণহত্যায় নিহত হন। দেশত্যাগের তাড়াহুড়োয় পার্শ্ববর্তী শেখ বাড়ির লোকজন দেই দিচ্ছি করে শেষ পর্যন্ত মাত্র ১ টাকার বিনিময়ে ঐ জমি হাতিয়ে নিয়ে বিদায় করে পরিবারটিকে।

চুকনগরে সেদিন কত লোক জমায়েত হয়েছিলেন, তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। অনেকের ধারণা লক্ষাধিক। স্থানীয়দের বর্ণনামতে, ১৭ মে থেকে ২০ মে সকাল পর্যন্ত ক্রমাগত মানুষ আসতে থাকে। একদল আসে একদল যায়। চুকনগর তখন লোকে লোকারণ্য। পার্শ্ববর্তী বটিয়াঘাটা, দাকোপের সিংহভাগ হিন্দু পরিবারই সেখানে এসে জড়ো হয়। বস্তুত সেদিন আটালিয়া ইউনিয়নের চুকনগর বাজার, চাদনী, ফুটবল মাঠ, স্কুল, পুটিমারী, মালতিয়া, রায়পাড়া, দাসপাড়া, তাঁতিপাড়া প্রভৃতি গ্রাম, পাতাখোলার বিল এবং ভদ্রা ও ঘ্যাংরাইল নদীর পাড়ে ও নৌকায় অগণিত মানুষ ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়ার জন্য গাইড এবং যানবাহনের অপেক্ষায় ছিলেন। পুরো এলাকাটা ছিল প্রায় এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের।
২০ মে বৃহস্পতিবার। বিনিদ্র রাত কাটিয়ে ভোরবেলায় প্রত্যেকেই কিছু চিড়ে, মুড়ি আবার কেউ বা সামান্য রান্না করে খাওয়া শুরু করেন, কেউবা খাওয়া শেষ করে ভারতের উদ্দেশে রওনা হবেন। এরই মধ্যে সকাল ৯টার দিকে সাতক্ষীরা থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অনেকগুলো সুসজ্জিত সামরিক যান এসে থামে পাতোখোলা বিলের পাশে। এর পর কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই গর্জে ওঠে হানাদার বাহিনীর অস্ত্র, বৃষ্টির মতো বর্ষিত হতে থাকে গুলি। দুদিক থেকে আক্রমণ করে তারা। সেনাবাহিনীর একটি দল কাঁচা রাস্তা দিয়ে গ্রামের ভিতরে প্রবেশ করে এবং অন্য আরেকটি দল পাকা রাস্তা দিয়ে চুকনগর বাজারে প্রবেশ করে পুরো চুকনগরকে দুদিক থেকে ঘিরে ফেলে। গ্রামে ঢুকেই তারা এলোপাথাড়ি গুলিবর্ষণ করতে থাকে। যাকে যেখানে পায়, তার ওপরেই গুলি করতে থাকে। একের পর এক গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে থাকেন অসহায় মানুষগুলো। সকাল ১০টার দিকে শুরু হয়ে প্রায় সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে এই বর্বরতম হত্যাকান্ড। সেই সৈন্যদের সাথে ছিল বেশ কয়েকজন এদেশীয় দোসর আর স্বার্থান্বেষী স্থানীয় কিছু লোকজন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সুসজ্জিত আগমন থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে, চুকনগরে পলায়নরত মানুষের অবস্থান সম্পর্কে তাদের কাছে নিশ্চিত তথ্য ছিল।
যখন সৈন্যরা চুকনগর বাজার ছেড়ে চলে যায়, তখন সমগ্র চুকনগর বাজার এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়। অগণিত মানুষের ভিড় এবং হৈ-চৈয়ের মধ্যে অনেকে কিছু বুঝতেই পারেননি, আবার অনেকে বুঝতে পেরেও পালাতে পারেননি। – অচেনা পথঘাটে, রাঁধতে অথবা খেতে বসেছিলেন কেউ কেউ, অনেকেই ছিলেন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। তাদের একত্র করে পলায়ন সম্ভব ছিল না। প্রাণভয়ে মানুষ সেদিন পুুকুরে, ডোবায়, ভদ্রাপাড়ের বিশাল ঘন গাবগাছে, কালীমন্দিরে, কালীবাড়ির বটের শেকড়ের নিচে বড় গর্তে পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পারেননি নিজেদের রক্ষা করতে। বটের আড়ালে থাকা মানুষগুলোকে সৈন্যরা নৌকা থেকে গুলি করে মারে, গাবগাছের মানুষগুলোকে মারে পাখি মারার মতো। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় অনেককে। সর্বত্র লাশের স্তূপ। পাতোখোলা বিল আর পাশে ভদ্রা নদীতে অগণিত লাশ। অনেকে সাঁতরিয়ে অথবা নৌকায় করে নদী পার হওয়ার সময় তাদের গুলি করা হয়। অনেকে জীবন বাঁচাতে পুকুরে পানির নিচে ডুব দিয়ে থাকেন। কিন্তু বর্বর পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদের সেখানেও গুলিবর্ষণ করে। গ্রামের পুকুর আর ভদ্রা নদীর পানি সে দিন মানুষের তাজা রক্তে লাল হয়ে যায়।

বটিয়াঘাটার দেবীতলা গ্রামের প্রফুল্ল কুমার ঢালীর ভাষায়, “সেদিন কত লোক দেখিলাম বলা মুশকিল। আমি ওখানে কয়েক বিঘা এলাকা ঘুরিছি। সব জায়গায় শুধু লাশ আর লাশ। গায়ে গায়ে লাশ। লাশের উপরে লাশ। সব মরি পড়ি আছে। কোথাও পা দেয়ার জায়গা নাই। অনেক সময় লাশ পারায় যাইতে হইছে। নদীর পাশ দিয়াও অনেক লাশ। নদীর ভিতরেও অনেক লাশ ভাসতিছে। রক্তে চারদিক লাল হয়া গেছে। মাটি-জল সব লাল।” সে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য! হাজার হাজার লাশের মধ্যে গুলিবিদ্ধ অনেকেই তখনো বেঁচে, আহত ও অর্ধমৃত সেই মানুষগুলোকে উদ্ধার করারও কেউ নেই_ ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন অসহায়ভাবে। ঘাতকের বুলেট মায়ের বুকে বিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন মা, কিন্তু অবুঝ শিশু তখনও অবলীলায় মৃত মায়ের স্তন মুখে নিয়ে ক্ষুধা নিবারণের ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। মৃত মায়ের কোলে সন্তানের লাশ, ভদ্রা নদীতে মরা মাছের মতো ভেসে ছিল লাশ। ভদ্রা নদীর পানি দুর্গন্ধময় হয়ে যায়।
পাকিস্তানি সৈন্যরা এ গণহত্যার ফাঁকে অসহায় অনেক নারীর ওপরও পাশবিক নির্যাতন চালায়। গ্রামের অনেকগুলো হিন্দু বাড়িতে তারা অগ্নিসংযোগ করে। লাশ, রক্ত, পোড়া গাছপালা এবং কিছু পরিত্যক্ত বাড়ি ছাড়া আর কিছুই ছিল না সেদিন চুকনগরে। চুকনগরে প্রাণের অস্তিত্ব থাকা পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনী স্থান ত্যাগ করেনি। লাশের স্তূপ আর রক্তের নদী দেখে তারা মেতে উঠেছে বীভৎস উল্লাসে। সৈন্যরা যাবার সময় তাদের এদেশীয় দোসরদের লাশ সরানোর নির্দেশ দিয়ে যায়। এ সময় কয়েকজন নারীকে তারা ট্রাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়।

গণহত্যার পর ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া প্রায় সবাই ভারতে চলে যান। দেশ স্বাধীন হওয়ার অনেকে ফিরে আসেন। তারা তাদের স্বজনদের হারিয়ে এবং অনেকেই আহত শরীরের যন্ত্রণা বয়ে নিয়ে বেঁচে ছিলেন। এখনও বেঁচে আছেন অনেকেই। স্থানীয় মানুষের বর্ণনামতে, সেদিন নিহতের পাশাপাশি আহত হয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ। আহতদের হৃদয়বিদারক চিৎকারে এলাকার গরু-ছাগল ইত্যাদি ভয়ে এলাকা থেকে পালিয়ে গিয়েছিল।

সেদিনের ঘটনাপ্রবাহে দেখা যায়, চুকনগরে পাকিস্তানি আক্রমণের মূল লক্ষ্য ছিল সেখানে আশ্রয় নেয়া লক্ষাধিক শরণার্থীর পুরুষ সদস্য যাদের প্রায় শতকরা শতভাগই ছিলেন হিন্দু। সৈন্যরা এসেছিল সাতক্ষীরা থেকে জীপ ও ট্রাকে। তাদের পথ চেনাতে সহায়তা করে স্থানীয় দোসররা। প্রত্যক্ষদর্শী ডুমুরিয়ার শিবনগর গ্রামের কৃষ্ণপদ রায়ের বর্ণনায় তেমনই প্রমাণ মেলে_ “আমরা বৃহস্পতিবার চুকনগরে আসি। অনেকে বুধবার এসেছিল। সে সময় একটা জনরব উঠেছিল যে বৃহস্পতিবার সবাই ভারতে চলে যাবে। সেদিনই পাকিস্তানি সৈন্যরা সকাল ১০টা-সাড়ে ১০টায় চুকনগরে আসে। আমরা নৌকা থেকে নেমে কেবল ভাত-টাত খাওয়ার ব্যবস্থা করছি। ঠিক সেই সময়ে প্রায় ৮-১০ জন মিলিটারি ট্রাক থেকে নেমে আমাদের লাইনে দাঁড়াতে বলে। লাইন দেয়ার পর যখন ফাঁকা আওয়াজ করে তখন মনের মধ্যে ভালো ঠেকল না। বাবা আমার সামনে ছিল। বাবাকে বললাম ‘বাবা ভালো মনে হচ্ছে না।’ সে বলল, ‘না, ওরা কিছু বলবে না। আশ্চর্য! চুপ করে থাক, কিছু বলবে না?’ তাই তখন ফাঁকা আওয়াজ করলেই আমি নদী সাঁতরিয়ে চলে গেলাম। আমি যখন সাঁতরিয়ে যাই তখন আমার খোকার বয়স এক বছর। আমি আমার বাচ্চাকে নিয়ে দৌড়ে গ্রামের ভিতরে যেয়ে একটা গাছের মুড়োর ভিতরে ঢুকে ছিলাম। একটু পরে মিলিটারি এসে কিন্তু গাছের পথ ধরে লাফ দিয়ে ঐ আড়ালটা পার হয়ে ওপাড়ে যেতে লাগলো। আর স্থানীয় ৫-৭ জন লোক মিলিটারিদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল। তারা ৭-৮ জন পাকিস্তানি মিলিটারির সাথে ‘নারায় তকবির, আল্লাহু আকবার’ এই সমস্ত বলতে বলতে চয়ে যায়। আর্মিরা বিকেল ৪টার দিকে চলে গেলে বাচ্চাটাকে নিয়ে ফিরে এসে দেখি বাবা পড়ে আছে, মা লাশ নিয়ে বসে আছে। বাবাকে দেখে আমি কান্নায় ভেঙে পড়লাম।” স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য থেকেও জানা যায়, চেনাজানা লোকজন আর্মিদের নিয়ে আসে। না হলে মালতিয়া ও বিভিন্ন গ্রামের অাঁকাবাঁকা ভাঙাচোরা সংকীর্ণ মাটির রাস্তা চিনে আর্মিদের এক ভাগ পাতোখোলার বিল, ঘ্যাংরাইল নদী ও হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামকে ঘিরে এসব স্থানে আশ্রয়নেয়া হাজার হাজার শরণার্থীকে আক্রমণ করবে কীভাবে। তাদের আর এক ভাগ চুকনগর মোড় ছাড়িয়ে খুলনাগামী রাস্তা ও ভদ্রা নদীর কূলজুড়ে ব্রাশ ফায়ার করতে করতে অগ্রসর হয়। কেউ তাদের শনাক্ত করার সুযোগ পায়নি। বেঁচে যাওয়া যে-সকল নারী অসহায়ভাবে আক্রমণকারীদের দেখেছেন_ তারা বহু দূরের মানুষ, স্থানীয় কাউকে তাদের চেনার কথা নয়।

সেদিন চুকনগরে কত মানুষ শহীদ হয়েছিলেন, – তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। ধারণা করা হয়, সেদিন কমপক্ষে ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষ মারা যান চুকনগরে। কত মানুষকে সেদিন পাকিস্তানি সৈন্যরা হত্যা করেছিল, তার সঠিক হিসাব কেউ দিতে না পারলেও ১০ থেকে ১৫ হাজার মানুষের লাশ নদীতে ফেলা হয়েছে বলে মনে করেন লাশ অপসারণের নিয়োজিত তৎকালীন যুবক শের আলী সরদার, কেসমত সারদার, ওয়াজেদ সরদারসহ আরও অনেকে। আটালিয়া ইউনিয়নের পাতাখোলার বিল থেকে ভদ্রা নদী এবং সাতক্ষীরা রোড থেকে ঘ্যাংরাইল নদী পর্যন্ত বিস্তৃত এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধ জোড়া বধ্যভূমি থেকে লাশ সরানোর কাজে যুক্ত ওয়াজেদ সরদার প্রমুখ ৪০/৪২ জন ব্যক্তি ২৪ মে সোমবার দুপুর পর্যন্ত চার হাজার লাশ গুণে শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দেন। এই গণনার মধ্যে নদী, পুকুর, ডোবা, জলায় ভাসমান হাজার হাজার লাশ অন্তর্ভুক্ত ছিল না। পাকিস্তানি সেনারাও অনেক লাশ নদীতে ফেলে দেয়।

বিশ্বের গণহত্যার ইতিহাস পর্যালোচনা করে জানা যায়, চুকনগর গণহত্যা বাংলাদেশ শুধু নয়, এটাই বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণহত্যা। বিশ্বের ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এতগুলো মানুষ এক সাথে প্রাণ দিয়েছে এমন ঘটনা নজিরবিহীন। বিশ্বে বৃহৎ গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে ১৯৬৮ সালের ১৬ মার্চ মার্কিন সেনাদের দ্বারা সংঘটিত ভিয়েতনামের ‘মাইলাই হত্যাকা-‘কে_ যেখানে নিহত হয়েছিলেন এক থেকে দেড় হাজার মানুষ। অথচ তার দশ গুণ বেশি মানুষ নিহত হওয়ার পরও বিশ্বইতিহাস দূরে থাক বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্রে চুকনগর গণহত্যার কথা উল্লেখই করা হয়নি। ‘চুকনগর ট্র্যাজেডি’ ছিল বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদারদের কৃত গণহত্যার একক বৃহত্তম ঘটনা। অথচ এ ঘটনার কথা অজানা থেকে গেছে দেশবাসী এবং বিশ্ববাসীর কাছে।

তথ্যসূত্র: সুকুমার বিশ্বাস সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধে খুলনা ও চুয়াডাঙ্গা।
মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত ১৯৭১: চুকনগরে গণহত্যা, বাংলাদেশ চর্চা, ঢাকা, মে ২০০২।
দেশটাকে ভালোবেসে, লেঃ কর্নেল (অবঃ) কাজী সাজ্জাদ আলী জহির বীরপ্রতীক, শুধুই মুক্তিযুদ্ধ, ঢাকা। ওয়েবসাইট।

%d bloggers like this: