শুধু আনন্দবাজার নয়, যে কোন প্রগতিশীল সেক্যুলার দাবীকৃত ব্যক্তি, মিডিয়া, প্রতিষ্ঠানের কাছেই প্রশ্নটা রাখা হলো…।

পশ্চিম বাংলার আনন্দবাজার পত্রিকার একটি মন্তব্য প্রতিবেদন নিয়ে কিছু বলব। প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘হামলাকারীর পরিচয় জেনেই কি এতটা বদলে গেল ট্রাম্পের সুর’? ডোনাল ট্রাম্প সাম্প্রদায়িক বর্ণবাদী প্রেসিডেন্ট হতে পারেন। সেই মোতাবেকই তার কাছে রাজনৈতিক ইস্যু গুরুত্ব পাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেক্যুলার মিডিয়া কি করে ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে সাধারণ সন্ত্রাসী ঘটনাকে তুলনা করে উপস্থাপন করে? ট্রাম্প যদি বর্ণবাদী রাজনীতি করে তাহলে এই শ্রেণীর মিডিয়া ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদকে সরলীকরণ করে নিজেকে কি রূপে প্রতিষ্ঠা করছে সেই প্রশ্ন তোলা রইল।

http://www.anandabazar.com/international/trump-reacts-in-different-fashion-after-new-york-attack-than-he-did-during-las-vegas-dgtl-1.700040?utm_source=facebook&utm_medium=social&utm_campaign=daily

ম্যানহাটনে সাইফুল নামের একজন জিহাদী পথচারীদের উপর ট্রাক তুলে দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে ৮ জন নিরহ মানুষকে হত্যা করেছে। কাজটা সে করেছে তার ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে। তার মুখে ছিলো মুসলমানদের ধর্মীয় শ্লোগান ‘আল্লাহো আকবর’। সাইফুলের ধর্মীয় কর্তব্য নিয়ে যাদের মনে বিতর্ক আছে আপাতত সেটা তুলে রাখুন। সাইফুল সঠিক ইসলাম পালন করেছে কিনা কিংবা সাইফুল যেটাকে ইসলাম বলে জেনেছে সেটা সত্যিকারের ইসলাম কিনা- এরকম বিতর্ক চলতেই থাকবে। আপনি শিয়াদের ভুল ইসলাম অনুসারী বলে দাবী করতে পারেন। আবার আপনি শিয়া হিসেবে সুন্নীদের ভুল ইসলামের অনুসারী মনে করতেই পারেন। এমনি করে ইসলামের ৭২ ফিকরায় বিভক্ত পরস্পরকে ভুল ইসলামের অনুসারী মনে করতেই পারে। তবে প্রত্যেকেই নিজের ইসলামকে সঠিক জেনেই মান্য করে। সাইফুলের ট্রাক হামলা জিহাদের একটি অংশ। জিহাদী দল আইএস যেদিন থেকে পশ্চিমা কাফের নারী-পুরুষদের উপর ট্রাক হামলা চালাতে বলেছিলো তখন থেকেই ইউরোপ-আমেরিকায় একের পর এক ‘ট্রাক জিহাদ’ ঘটে চলেছে। এই ঘটনাগুলো সম্পূর্ণই ধর্মীয় সন্ত্রাস। গেল মাসের শুরুতে লাস ভাগাসে ঘটা ভয়াবহ সন্ত্রাসী ঘটনা যেখানে বন্দুকধারীর গুলিতে ৫৮ জন মারা গিয়েছিলো, আনন্দ বাজার এই ঘটনার সঙ্গে ম্যানহাটনের সাইফুলের ঘটনাকে তুলনা করেছে। তাদের ভাষ্য, সাইফুল মুসলমান বলেই তার ঘটনায় ট্রাম্প বড় প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে আর লাস ভাগাসের হামলাকারী স্টেফিন প্যাডক খ্রিস্টান বলেই ট্রাম্পের সুর নরম ছিলো…।

স্পেফিন প্যাডক যদি খ্রিস্টান ধর্মের দোহাই দিয়ে এই ৫৮ জনকে হত্যা করত তাহলে এটাকে ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের তালিকাতে ফেলা যেতো। প্যাডকের এই খুন কোন ধর্মীয় বা বর্ণবাদী কোনভাবেই ঘটেনি। এটি আমেরিকার অগুণতি ‘বন্দুকধারীদের’ হত্যাযজ্ঞ যা আমেরিকার একটি জাতীয় সমস্যা। এটি একটি সন্ত্রাসের ঘটনা। কিন্তু কোনভাবেই কি ধর্মীয় সন্ত্রাসের ফাইলে একে রাখা যায়? তাহলে তো রোজ পৃথিবীতে যত চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ ঘটে তাতে অপরাধীদের ধর্মীয় পরিচয় ধরে বলতে হবে অমুক খ্রিস্টান, তমুক হিন্দু ডাকাতি করেছে। তমুক মুসলমান চুরি করেছে। এই চাতুরীটা করেছিলেন বাংলাদেশের বাম বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দি উমার। তিনি বাংলাদেশে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ এই পরিসংখ্যান দেখিয়ে বলেছিলেন এদেশে হিন্দুরা নয় মুসলমানরাই নির্যাতিত। কারণ প্রতিদিন যত সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটে সংখ্যায় মুসলমানরা বেশি বলে তারাই বেশি ভিকটিম হয় তাই বাংলাদেশে হিন্দু নয়, মুসলমানরাই বেশি নির্যাতিত! ধর্মীয় নির্যাতনকে এভাবে সাধারণ হামলা মামলার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়েছিলো যখন নাসিরনগরে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক হামলা চালানো হয়েছিলো ইসলামপন্থিদের উশকানিতে। যখন নিপীড়িতদের পক্ষে দুটো কথা বলার কথা তখনই এই সমাজতন্ত্রী উল্টো ভিকটিমদের নিয়ে বলতে গেলে টিটকারি করেছিলেন…।

আনন্দবাজার ঠিক এরকম একটি মন্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। স্টেফিন প্যাডক একাই ৫৮ জনকে হত্যা এবং ৫০০ জনকে আহত করেছিলো। সাইফুল সেখানে আল্লাহো আকবর বলে মাত্র ৮ জনকে হত্যা করতে সক্ষম হয়েয়ে। দুটো ঘটনার মধ্যে অবশ্যই প্যাডকের ঘটনাটি বড়। কিন্তু চরিত্রে দর্শনে কি একই? প্যাডক যেহেতু কোন রকম ধর্মীয় দর্শন খাড়া করে এই হামলাটি চালায়নি, এমনকি অন্য কোন রাজনৈতিক দর্শনের কথাও জানা যায়নি কাজেই বলা চলে প্যাডক নিছক পাগলামী করেছিলো। কিন্তু সাইফুল সুনির্দিষ্ট একটি দর্শনের সমর্থনে এই কাজ করেছে। সে তার দর্শনের সমর্থনে শ্লোগান দিয়ে হত্যায় অংশগ্রহণ করেছে। ট্রাম্প বর্ণবাদে অন্ধ হবে বলেই কি আনন্দবাজারকেও অন্ধ হতে হবে? শুধু আনন্দবাজার নয়, যে কোন প্রগতিশীল সেক্যুলার দাবীকৃত ব্যক্তি, মিডিয়া, প্রতিষ্ঠানের কাছেই প্রশ্নটা রাখা হলো…।