ইতিহাসের কোথাও বলা নেই “খ্রিস্টানরা” ভারতবর্ষ ২০০ বছর শাসন করেছিল, বলা আছে “ইংরেজরা” ২০০ বছর শাসন করেছে। কিন্তু ভারতবর্ষকে আরবরা শাসন করেছে বলা হয় না, বলা হয় মুসলমানরা শাসন করেছে। এই মুসলমান পরিচয়টি মুসলমানরাই খাড়া করেছে।

পাকিস্তানের আব্দুস সালাম নোবেল পেলে সেটা যতটা না কোন পাকিস্তানী পেয়েছে তারচেয়ে কয়েকশ গুণ একজন মুসলমান পেয়েছে। যদিও একজন লাদেনের যত কীর্তি তা নাকি তার নিজের, এর দায় মুসলমান বা ইসলামের নয়! মানুষের ক্রিয়েটিভ ক্ষমতা যা ইসলাম ধর্ম মতে হারাম, সেরকম কিছুর গৌরবকেও মুসলমানিত্ব আরোপ করে পরিস্কার বিভাজন আনা হয়।

যেমন বাংলা সাহিত্য, সেটা কি মুসলমান আর হিন্দু বিভাজনে ফেলে বিকৃত করা উচিত? বাংলা ভাষায় যারা সাহিত্য রচনা করেছেন, যদি তাদের জন্ম হয়ে থাকে মুসলমান ঘরে তাহলে অবধারিতভাবে তিনি “বাঙালী মুসলমান সাহিত্যিক” হয়ে যান। রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, শরৎচন্দ্রকে কি বলা হয় “বাঙালি হিন্দু সাহিত্যিক”?

কিন্তু মীর মোশারফ হোসেন, নজরুল… মুসলিমদের ভাষাতেই “বাঙালী মুসলমান সাহিত্যিক”! আবদুল মান্নান সৈয়দ তার জীবনব্যাপী “বাঙালী মুসলমান সাহিত্যিকদের” নিয়ে গবেষণা করে গেছেন। এই প্রখ্যাত জীবনানন্দ গবেষক কি জীবনানন্দ দাসকে একজন “হিন্দু সাহিত্যিক” বলে মানতেন?

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার আত্মজীবনী “অর্ধেক জীবনে” একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছিলেন, বাংলাদেশ সফরের সময় ফেরিতে দাড়িঅলা এক যুবক তার দিকে একটা বই এগিয়ে দিয়ে অটোগ্রাফ চাইল। সুনীল হাসি মুখে অটোগ্রাফ দেয়ার পর যুবকটি বলল, ভারতের “হিন্দু” লেখকদের মধ্যে আপনার লেখাই আমার ভাল লাগে…।

সুনীল লিখেছেন, সারাজীবন অসাম্প্রদায়িক, সেক্যুলার মনোভাব নিয়ে লেখালেখি করে আজ শুনতে হলো আমি হিন্দু লেখক! মনে হলো ছেলেটি যেন আমার মুখে একটা কঠিন চপেটাঘাত করে গেলো…।

এই ঘটনাটি যদি বাংলাদেশের কোন “মুসলিম লেখককে” কোলকাতার কোন যুবক এইভাবে বলে, বাংলাদেশের “মুসলমান” লেখকদের মধ্যে আপনার লেখাই আমার সবচেয়ে ভাল লাগে- বাংলাদেশের কতজন “মুসলিম লেখক” কঠিন চপেটাঘাত অনুভূব করবেন? আমার নিজের ধারনা সংখ্যাগরিষ্ঠই মন:ক্ষুন্ন হবেন না।

সুনীল না হয় নাস্তিক ছিলেন, কিন্তু শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়কেও এরকম “হিন্দু লেখক” বলে অভিহত করলে তিনি নিশ্চিত চমকে উঠবেন।

বাংলা ভাষায় আমার চোখে আজ অব্দি পড়েনি এমন কোন বই (কেউ দেখলে আমাকে জানাবেন) যেটার শিরোনাম, “সেরা ১০০ বাঙালী হিন্দু বৈজ্ঞানিক” বা “শ্রেষ্ঠ বাঙালী হিন্দু মনিষি” এই জাতীয় কোন কিছু। কিন্তু বাংলাদেশের যে কোন বইয়ের দোকানে “বাঙালী মুসলমান শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক” বা “শ্রেষ্ঠ মুসলমান মনিষি” বই গড়াগড়ি খাচ্ছে।

পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রনাথ হয়েছিল মালাউন কবি। রবীন্দ্রনাথ-জীবনানন্দ রচনাবলীকে এক লাত্থিতে যশোর রোড দিয়ে বার্ডার পাস করেই পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল। তারপর এই মুসলমান জাতি পাঠান, পাঞ্জাবীদের আত্মপরিচয়ের কাছে মার খেয়ে ফের রবীন্দ্রনাথের কাছে আশ্রয় চায়।

বন্দুকের নলের মুখে রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী পালন হয় “মুসলিম বাংলায়” তথা পূর্ব পাকিস্তানে। কামাল লোহানী একবার টিভিতে বলেছিলেন, আমরা লাঠি হাতে রবীন্দ্রনাথের জন্মবার্ষিকী পালন করেছি!…

কথাটা তিনি বলেছিলেন কটাক্ষ করে পশ্চিম বাংলার সাহিত্যিকদের তুলনায় “রবীন্দ্রনাথ সত্ত্ব” বাংলাদেশের বেশি বুঝাতে। কথাটা শুনে আমার হাসি পেয়েছিল! কমল কুমার মজুমদার নাকি সুনীল-শরৎ মুখোপাধ্যায়দের কাছে ঠোট বাঁকিয়ে বলতেন (তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন চলছে) মুসলমানরা আবার বাঙালী হতে চাচ্ছে নাকি-এ্যাঁ?…

কার্যত একদা “বাঙালী মুসলমানরা” কিছুদিন আগে “মুসলমান বাঙালী” হতে চাইলেও এখন সেটা দিনকে দিন শুধু “মুসলমান”-এ গিয়ে ঠেকছে।

এই কিছুদিন আগেই সৈদয় শামসুল হক বললেন, বাংলা একটাই। মানে সেটা বাংলাদেশ। এখন যদি পশ্চিম বাংলার কেউ বলেন, বাঙালী জাতি একটাই আর সেটা…। পলি মাটির এই শ্যামল বাংলায় এখনো কিছু মানুষ জানি চিৎকার করে প্রতিবাদ করবেন।

তাদের আত্মপরিচয়ে একটু ঝাঁকানি দিয়ে বলতে চাই, ভাইলোগ, বিসমিল্লাতেই গলদ, নিজের নামটাই তো আরবী! নাম শুনে মনে হয় মুসলমান আরব…।

যাক, নিজেদেরটা তো আর সংশোধন হবে না, নিজেদের সন্তানদের নিয়ে ভাবুন। নামটা প্রথমেই বাংলায় রাখার অভ্যাস করুন। বাঙালীর নাম বাংলায় হবে- এই সহজ বিষয়টি ধরতে না পারলে আত্মপরিচয় সম্পূর্ণ হবে না। বাঙালী মুসলমান আধা বাঙালীই হয়ে থাকবে।

আমি জাতীয়তাবাদী নই, কিন্তু একটা জাতির আত্মপরিচয়ই যদি ঠিক না থাকে তাহলে সে বৈশ্বিক হতে পারবে না- এই সত্যটিই মনে করিয়ে দিতে চাই শুধু…।

আর পড়ুন…