আর্যরা বহিরাগত নয়: আর্য দ্রাবিড় এক জনজাতি, ‘আর্যরা বহিরাগত’ এই তত্ত্বের উদ্ভাবনের কারণ? আর্যরা বহিরাগত নয়: আর্য দ্রাবিড় এক জনজাতি, “আর্যরা বহিরাগত আক্রমণকারী- একটি ভুল ইউরোপীয় তত্ত্ব” অষ্টাদশ শতাব্দীতে এই তত্ত্বের উদ্ভব হয়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী আর্য হলো ককেসিয় পার্বত্য অঞ্চল থেকে আসা গৌরবর্ণ, উন্নত নাক, নীল চোখের মানুষ যারা খ্রী:পূ: ১৫০০ শতকে ভারত আক্রমণ করে। এরা ঘোড়ার ব্যবহার জানতো। ঘোড়ায় টানা রথ এদের প্রধান যোগাযোগের ব্যবস্থা ছিল। এরা লোহার ব্যবহার জানতো। এরা এদের সঙ্গে বেদ নিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছিল। সংস্কৃত এদের ভাষা ছিল।

এদের আক্রমণে হরপ্পা মহেঞ্জোদারোর উন্নত নগর সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায়। কারণ আর্যরা লোহার ব্যবহার জানতো কিন্তু হরপ্পা সভ্যতার মানুষ তাম্র ও ব্রোঞ্জের ব্যবহার জানলেও লোহার ব্যবহার জানতো না। হরপ্পা সভ্যতার মানুষের গায়ের রঙ কালো ছিল। এরা আর্যদের কাছে পরাজিত হয়ে বিন্ধ্য পর্বত পেরিয়ে দাক্ষিণাত্যে চলে যায় ও কালক্রমে এদের থেকেই দ্রাবিড় জনজাতির উৎপত্তি হয়।

 

এই আর্যরা আসলে যাযাবর জাতি ছিল। এরা নাগরিক নয় গ্রামীণ সভ্যতার সৃষ্টি করে যা হরপ্পা সভ্যতার থেকে অনুন্নত ছিল। এই আর্যরা ইউরোপ থেকে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এক অংশ ইরান বা পারস্যে যায়। একটি অংশ পশ্চিম ইউরোপে যায়। একটি অংশ দক্ষিণে হিন্দুকুশ পর্বত অতিক্রম করে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করে। তাই সংস্কৃত, পারসী ও ইউরোপীয় ভাষার আকারগত মিল খুঁজে পাওয়া যায়। প্রাচীন এই ভাষার মিলের জন্য এদের এক ভাষা গোষ্ঠীর মধ্যে রাখা হয়, ‘প্রোটো ইন্ডো ইউরোপীয়’ ভাষা গোষ্ঠী।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠা করার এটি ছিল এক ঘৃণিত ষড়যন্ত্র। ইতিহাসের বিকৃতি করা হয়, সাহায্য হিসাবে বেদের ইংরেজি অনুবাদ করা হয় ও অর্থ সুবিধামত করা হয়। তৎকালীন ভারতীয়দের অজ্ঞতা, অজ্ঞানতা এবং বিদেশীদের উপর অন্ধ ভরসা এই কাজ সহজ করে দেয়। নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য তারা এত নীচে গেছিল ভাবতে অবাক লাগে। আসলে উপনিবেশ স্থাপনের মূল ভিত্তিই তো পরাজিত জাতিকে হেয় করা, তার সংস্কৃতিকে হেয় করা। এই তত্ত্বের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি বা প্রামাণিকতা ছিল না। কিভাবে এই তত্ত্ব সৃষ্টি হলো, এর পর সেটাই আলোচনা করবো।

 

আর্যরা বহিরাগত আক্রমণকারী -এই তত্ত্বের উদ্ভাবক ইউরোপীয় পণ্ডিতরা

‘আর্যরা বহিরাগত আক্রমণকারী’ এই তত্ত্ব প্রধানতঃ Abbe Dubois এবং Max Muller এর লেখায় বহুল প্রচলিত হয়। Abbe Dubois এর লেখা ফ্রেঞ্চ বই এর ইংরেজি অনুবাদ ‘Hindu Manners Customs And Ceremonies’ (1897), এই বইতে তিনি আরব ও মিশরের মানুষদের ভারতে আসার পরিবর্তে ককেসিয় অঞ্চলের মানুষের ভারতে আগমনের সপক্ষে বলেন।

ষোড়শ শতাব্দীতে ফ্লোরেন্সের এক ব্যবসায়ী Filippo Susseti প্রথম সংস্কৃত ও ইউরোপীয় প্রধান ভাষার সাথে মিল খুঁজে পান। পরে 1786 সালে বেঙ্গল এশিয়াটিক সোসাইটিতে স্যার উইলিয়াম জোন্স এই তত্ত্বকে সমর্থন করেন। পরবর্তী কালে ভাষাতত্ত্ববিদ ম্যাক্স মুলার এই তত্ত্বকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যান। তার ‘Lecture On The Science Of Languages’ এ এই তত্ত্বকে আরো প্রামাণ্য করে তোলেন এই বলে যে সংস্কৃত, পারসি, গ্রীক, ল্যাটিন, জার্মান, গথিক ও সেলটিক, এই সাতটি ভাষাকে ইন্ডো আর্য ভাষা বলা হয় এদের মধ্যে ভাষাগত মিলের জন্য।

 

এদের ‘প্রোটো ইন্ডো ইউরোপীয়’ ভাষা গোষ্ঠী বলে চিহ্নিত করা হয় যার মধ্যে মাত্র দুটো ভাষা ইউরোপের বাইরের ভাষা। কাজেই ম্যাক্স মুলার এই সিদ্ধান্তে আসেন যে যেহেতু এরা একটিই প্রাচীন ভাষা গোষ্ঠীর অন্তর্গত ভাষা, কাজেই তাদের পূর্ব পুরুষ সবাই এক জায়গায় বসবাস করতো। আর মাত্র দুটো এশিয় ভাষা বলে ধরে নেওয়া হয় এদের আদি বাসস্থান ইউরোপ ছিল।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে আর্যদের খুব উন্নত বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় 1920 সালে হরপ্পা মহেঞ্জোদারোর সভ্যতা আবিষ্কারের পর। কারণ পুরাতাত্ত্বিক ভাবে প্রমাণিত হয়ে যায় যে হরপ্পা সভ্যতা অত্যন্ত উন্নত ছিল। তখন এই তত্ত্বকে বদলে দেওয়া হয়, আর্যদের যাযাবর জনজাতি বলে উল্লেখ করা হয়। কোনো তত্ত্বের প্রামাণিকতা বা বৈধতা ছিল না। হরপ্পা সভ্যতার আবিষ্কারের পর নতুন আর এক ঘৃণ্য চক্রান্ত হলো।

 

বলা হলো বহিরাগত আর্যরা উন্নত অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে নাগরিক কিন্তু অনুন্নত হরপ্পা সভ্যতাকে ধ্বংস করে। পরাজিত হরপ্পা সভ্যতার মানুষ তাদের আদি বাসভূমি ছেড়ে দক্ষিণে প্রস্থান করে ও এই ভাবে কালক্রমে দ্রাবিড় জনজাতির উদ্ভব হয়। তাই এদের ভাষা গোষ্ঠী আলাদা, গায়ের রঙ আলাদা, সংস্কৃতি ভিন্ন। এদেরকেই আর্যরা নিম্ন বর্ণ শূদ্র বলে অভিহিত করে বেদে। এখানে এক সাথে ভারতে দুই আলাদা জনজাতির উদ্ভব করা হলো, জাতিভেদের উৎপত্তি দেখানো হলো।

এই ইতিহাস বিকৃত করার পিছনে খ্রীস্টান মিশনারীদের অবদান বিরাট। বাইবেলের সময়পঞ্জী অনুসরণ করে এই তত্ত্ব তৈরি করা হয়। বাইবেল অনুযায়ী পৃথিবীতে সভ্যতার সূত্রপাত 4000 খ্রী: পূ: সময়ে হয়। বন্যার সময় 2500 খ্রী: পূ: বলে উল্লেখ করা আছে। তাই আর্যদের ভারতে আগমনের সময় ধরা হয় 1500 খ্রী: পূ: নাগাদ। কিন্তু কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ কেউ দিতে পারেনি। সবটাই নিজেদের মস্তিষ্ক প্রসৃত কল্পনা। এই তত্ত্বের উদ্ভাবনের পিছনে আসল কারণ ছিল, আর সেটা রাজনৈতিক। এর পরের পর্বে সেই কারণের খোঁজ করবো আমরা।

 

‘আর্যরা বহিরাগত’ এই তত্ত্বের উদ্ভাবনের কারণ:

‘আর্যরা বহিরাগত’ এই তত্ত্ব সম্পূর্ণ ভাবে ইউরোপীয় মস্তিষ্ক প্রসূত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। ইউরোপীয়রা এসেই আগে ভারতীয় ভাষা শিখে নেয়। তারপর সব পুঁথি, মহাকাব্য পড়ে ও এত বিস্তৃত, এত সভ্য সমাজের খোঁজ পেয়ে ওরা বিস্মিত হয়ে যায়। প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার দর্শন, বিজ্ঞান, আয়ুর্বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, স্থাপত্য বিজ্ঞান এতটাই উন্নত ছিল যে অষ্টাদশ শতাব্দীতেও ইউরোপীয় পণ্ডিতদের ভাবনার বাইরে ছিল। কিন্তু আত্ম অহংকারী শ্বেতাঙ্গরা মেনে নিতে পারেনি যে কৃষ্ণাঙ্গরা তাদের থেকে উন্নত। তাই শুরু হলো ক্ষমতা ও বুদ্ধির অদ্ভুত নোংরা রাজনীতির খেলা।

বিখ্যাত French Philosopher Voltaire প্রায় 200 বছর আগে বলে গেছেন “I am convinced that everything has come down to us from the banks of the Ganges, astronomy, astrology, metempsychosis, etc. . . It does not behove us, who were only savages and barbarians when these Indian and Chinese peoples were civilized and learned, to dispute their antiquity.”

 

আর্যরা বহিরাগত নয়
আর্যরা বহিরাগত নয়

আর্যদের এই জন্য ইউরোপীয়দের মত দেখতে বলা হলো, সংস্কৃত ভাষার সাথে ইউরোপীয় ভাষার মিল দেখিয়ে ভারতীয়দের বোঝানো হলো যে বহু আগে আর্য এসেছিল আর অষ্টাদশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ এসেছিল। দুজনেই একি রকম দেখতে, দুজনের ভাষার মূল ভাষাও এক। সেদিন আর্যরা তাদের সাথে বেদ নিয়ে এসেছিল ও আদি ভারতীয়দের শিক্ষিত করেছিল। ঠিক ব্রিটিশও তার সাথে ইংরাজী শিক্ষা এনেছে যা ভারতীয় সেই সময়ের শিক্ষার থেকে গুণমানে অনেক উন্নত।

এর সাথে সূক্ষ্ম ভাবে বিভাজনের নীতিও চালু হলো। উত্তর ভারতীয়দের সাদা আর্যদের বংশধর ও কালো দক্ষিণ ভারতীয়দের আদি ভারতীয় বলা হলো। ভারতীয় জাতিকে আর্য ও দ্রাবিড়, দুই ভাগে ভাগ করে দিলো। কোনো নৃতত্ত্ব, পুরাতত্ত্ব প্রমাণ দেওয়া হলো না। অবিশ্বাস ও ঘৃণার বীজ বোনা হয়ে গেলো।

 

অন্যদিকে ইংরেজী শিক্ষা চালু হলো। কলকাতা ছিল সে সময় ব্রিটিশ রাজধানী। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রতিষ্ঠা হলো। ভারতীয় প্রথাগত শিক্ষা উঠিয়ে ব্রিটিশ শিক্ষা পদ্ধতি শুরু হলো। এই সব শিক্ষা পদ্ধতি মূলতঃ মিশনারী দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হলো। সনাতনী হিন্দু ধর্মের কোনো ভাল দিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে তুলে ধরা হলো না। কুসংস্কারাচ্ছন্ন হিন্দু ধর্ম, এটাই প্রচার হলো। ঠিক এই সময় ইউরোপীয়রা বেদ, মনুসংহিতার অনুবাদ করলো। সেখানেও অনেক অসত্য ও ভুল ব্যাখ্যা হলো। শিক্ষিত সমাজ ধীরে ধীরে হিন্দু ধর্মের প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ হয়ে গেলো। যেহেতু বাংলায় প্রথম ইংরেজি শিক্ষা শুরু হয়েছিল, বাঙালি হিন্দু ধর্ম বিমুখ হয়ে গেলো। স্বামী বিবেকানন্দ ও ঋষি অরবিন্দ ছাড়া অন্য কেউ হিন্দু ধর্মের হয়ে কথা বললেন না। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস হারিয়ে গেলো।

 

প্রাচীন কাল থেকে ভারতীয় সভ্যতাই একমাত্র সভ্যতা যার ধর্ম অপরিবর্তিত আছে। আর তার ভিতরের সত্যতা কেউ অনুভব না করে বিদেশী শিক্ষা পদ্ধতি যে উন্নততর, সবাই এক বাক্যে মেনে নিলো। আর এই ভাবেই শুরু হলো দেশীয় সভ্যতার প্রতি অবজ্ঞা ও অবহেলা। আর্যভট্ট, বরাহমিহির, সুশ্রুত, ধন্বন্তরি, কপিল মুনি, ঋষি গৌতম বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেলো। হিন্দু ধর্মের বদলে অন্য ধর্মের কথা বলা ফ্যাশন হয়ে গেলো। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য বলিদান হয়ে গেলো আমাদের সভ্যতা আর আমরা নির্বিকারে সেটা মেনে নিলাম।

এদিকে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় ও দক্ষিণ ভারতে শুরু হলো অন্য খেলা। আর্যদের জন্য যে তারা তাদের বাসস্থান হারিয়েছে, সেটা মগজ ধোলাই করে ঢোকানো হলো। শুরু হলো মিশনারীদের ধর্মান্তর অভিযান।

ঋষি অরবিন্দ সঠিক মূল্যায়ন করেছিলেন যে ভারতে বহু পূর্বে আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক সম্পূর্ণ ঐক্য ছিল যা হিমালয় পর্বত ও সমুদ্রের মাঝখানের ভূমিতে মানবতার বিকাশ ঘটিয়েছিল। পাশ্চাত্য সভ্যতা শিল্প বিপ্লবের তিনশ বছর পরেই শ্বাসরোধ হয়ে যাচ্ছে। এর কোনো দিশা, সুস্থ সীমা নেই, লোভ ও স্বার্থপরতা ছাড়া কিছু বেঁচে নেই। আর ভারত একাই এমন এক গভীরতর মূল্যবোধ সংরক্ষণ করে এসেছে যে মানুষ থেকে মানবে পরিণত হয়েছে। যেদিন আমরা ভারতের প্রাচীনত্ব বুঝতে পারবো, আমরা তার এত বছর ধরে বেঁচে থাকার শক্তি ও উৎস খুঁজে পাবো। এই ভাবেই ভারত বেঁচে থাকবে, এই অবক্ষয়ের মধ্যেও। আর ভবিষ্যতে সমগ্র বিশ্বকে আবার পথ দেখাবে কিনা, সেটা একটা প্রশ্ন।

 

আর্যরা বহিরাগত আক্রমণকারী – একটি ভুল তত্ত্ব

ডঃ আম্বেদকরের একটি উক্তি দিয়ে শুরু করছি।
” The theory of (Aryan) invasion is an invention. It’s a perversion of scientific investigation, it is allowed to evolve out of facts…… It falls to the ground at every point. All available evidence shows that India’s civilization, whose roots go back even before the Harappan Civilization, grew on Indian soil. As the US Archaeologist Jim Shaffer puts it. “

১. আর্যরা ঘোড়ায় টানা রথে উত্তর পশ্চিম ভারতের দূর্গম পার্বত্য অঞ্চল পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করে। সঙ্গে তাদের লোহার আধুনিক অস্ত্র ছিল। হরোপ্পা সভ্যতায় এই দুটোর কোনটাই পাওয়া যায়নি বলা হয়। ** সম্পুর্ন ভূল একটি ধারনা। এই দূর্গম পার্বত্য অঞ্চল কোনভাবেই রথে করে অতিক্রম করা সম্ভব ছিল না। পরবর্তী সময়ে খননকার্যে শুধু সিন্ধু সভ্যতা নয় তারও আগের সময়েও ভারতে ঘোড়ার ব্যবহার হত বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। সিন্ধু সভ্যতার একটি সীলমোহরে চাকার চিহ্ন পাওয়া যায়। অর্থাৎ তারা চাকার ব্যবহার জানতো।

বেদে ‘আয়াস’ শব্দের মানে লোহা বলা হয়। যদিও জার্মান ও ল্যাটিনে ‘আয়াস’ শব্দের মানে ধাতব আকরিক। যজুর্বেদ ও অথর্ববেদে বিভিন্ন রঙের আয়াস যেমন লাল, সবুজ এর উল্লেখ আছে। অর্থাৎ এটা একটি শব্দ যেটা সম্ভবত ধাতুর পরিবর্তে ব্যবহৃত হত। ঋকবেদে আর্যদের শত্রুরাও ‘আয়াস’ তৈরী অস্ত্র ব্যবহার করে তাদের নগর তৈরী করেছিল। অর্থাৎ সেই হিসেবে সেই সময় লোহার ব্যবহার সবাই জানতো। বালুচিস্তানের বর্ডারে খ্রীঃ পূঃ ৩৬০০ তে ঘোড়ার নমুনা পাওয়া যায়। গুজরাট উপকুলে খ্রীঃ পূঃ ২৩০০ তে ঘোড়ার জিনের নমুনা পাওয়া যায়।

২. আর্যদের আক্রমনে সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংস হয়নি, সেটা এখন পুরাতাত্বিকভাবে প্রমানিত সত্য। আভ্যন্তরীন কারন ও ভয়াবহ বন্যা ছিল ধ্বংসের কারন। S R Rao এবং The national Institute of Oceanography র খননকার্যে দ্বারকা ও বেট দ্বারকা দুই শহরের নমুনা পাওয়া গেছে যা সিন্ধু সভ্যতা ও আর্য সভ্যতার মধ্যবর্তী। সেখানেও কোন বিদেশী প্রভাব দেখা যায়নি।

 

৩. সিন্ধু সভ্যতার ধর্ম ও আর্য সভ্যতার ধর্ম আলাদা ছিল বলে Wheeler উল্লেখ করেন যিনি ধর্ম বিষয়ে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন না। তিনি সিন্ধু সিভ্যতার মানুষ শৈব ছিলেন বলেন। গুজরাটের লোথাল, রাজস্থানের কালিবাঙ্গান অঞ্চলে বৈদিক শাস্ত্র অনুযায়ী ব্যবহৃত পূজা ও যজ্ঞের জিনিসপত্র পাওয়া গেছে। অর্থাৎ ধর্ম একই ছিল। শৈব ধর্ম বৈদিক ধর্মেরই একটি শাখা, সেটা আমরা সবাই জানি।

৪. সিন্ধু সভ্যতা সিন্ধু নদীর পশ্চিমে নয়, পূর্বে বিস্তৃত ছিল, সেটা পরবর্তী খননকার্যে প্রমানিত। পাঞ্জাব ও রাজস্থানের এইসব অঞ্চল প্রাচীন সরস্বতী যা বর্তমানে অবলুপ্ত নদীর ধারে ছিল। ঋকবেদে সরস্বতী নদী সবচেয়ে বেশী ব্যবহৃত হয়েছে ও ‘নদীমাতা’ বলে অভিহিত হয়েছে। কাজেই সিন্ধু সভ্যতার সাথে বৈদিক সভ্যতা যুক্ত ছিল। বর্তমান গবেষণায় দেখা যাচ্ছে সরস্বতী যা একসময় বিশাল এক নদী ছিল তা ধ্বংস হয়ে যায় ১৫০০ খ্রীঃ পূঃ এর আগেই। সেক্ষেত্রে ঋকবেদে সরস্বতীর উল্লেখ আশ্চর্যজনক কারণ এই তত্ত্ব অনুযায়ী আর্যদের ভারতে আগমনের সময় খ্রীঃ পুঃ 1500 শতাব্দী।

৫. ঋকবেদে বিভিন্ন নক্ষত্রের হিসেবে যে সময়ের হিসাব পাওয়া যায় তা খ্রীঃ পূঃ ২৪০০ এর। তারা সেই সময়েও জ্যোতির্বিজ্ঞান শাস্ত্রে পারদর্শী ছিল ও ভারতে বসবাস করতো।

6. ঋক বেদের অনুবাদ করেন গ্রিফিথ ও তাতে বলেন যে আর্যরা সমুদ্র সম্বন্ধে অবগত ছিল। 100 বারের মত ‘সমুদ্র’ শব্দ ব্যবহার হয়েছে, বহুবার জাহাজের উল্লেখ আছে, নদী যে সমুদ্রে মিশেছে তার উল্লেখ আছে। অর্থাৎ আর্যরা খুব ভাল ভাবেই সমুদ্রের সাথে পরিচিত ছিল। গ্রিফিথ সমুদ্রের মানে ocean লিখেও যখন অন্য ইউরোপীয় পণ্ডিতরা বললেন যে আর্যরা সমুদ্র মানে বড় জলাশয় বা নদী অর্থে ব্যবহার করেছে, উনি কিন্তু একবারো তাঁর নিজের লেখার উল্লেখ বা ব্যাখ্যা করেননি।

 

7. সমগ্র ঋক বেদে আর্যদের আদি ভূমি হিসাবে সপ্তসিন্ধু অঞ্চলকে বলা হয়। অন্য কোনো বিদেশী স্থানের উল্লেখ পর্যন্ত নেই। বহিরাগত কোনো জাতির পক্ষে তার নিজের মাতৃভূমি এত সহজেই ভোলা সম্ভব নয়

8. আলেকজান্ডারের আগে ভারতে বড় রকম বহিরাগত আক্রমণকারী আসেনি। কোথাও তার কোনো প্রমাণ নেই।

9. বৈদিক সংস্কৃতি যদি ভারতের বাইরের মানে ইউরোপীয় সংস্কৃতি হয়, তবে অন্য কোনো ইউরোপীয় জন গোষ্ঠীর মধ্যে বৈদিক সংস্কৃতির ছাপ পাওয়া যেতো। তেমন কোনো প্রমাণ কিন্তু নেই। বৈদিক স্লোক ভারত ছাড়া অন্য কোথাও উল্লেখ নেই।

10. ঋক বেদে যে সমস্ত গাছপালার নাম পাওয়া যায়, তারা কেউ উত্তরের ঠাণ্ডা অঞ্চলের নয়, বরঞ্চ ভারতীয় উপমহাদেশের।

11. সংস্কৃত ভারতের বাইরের ভাষা নয়। ঋক বেদের বৈদিক সংস্কৃত বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয়ে আজকের সংস্কৃত হয়েছে। ভারতের বাইরে অন্য কোথাও সংস্কৃত ভাষার প্রয়োগ বা প্রচলন নেই। ইউরোপীয় ভাষার সাথে সামঞ্জস্য প্রমাণ করে না যে সংস্কৃত ইউরোপের ভাষা। ভাষা বিভিন্ন ভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং তার উৎস দিয়ে জনজাতির উৎপত্তি খোঁজা বৈজ্ঞানিক ভাবে সিদ্ধ নয়। সংস্কৃত সব ভাষার আদি এটা প্রমাণিত। সব থেকে বেশি ব্যঞ্জন বর্ণের ব্যবহার সংস্কৃত ভাষায় দেখা যায়।

 

আর্য বহিরাগত নাহলে কারা এই আর্য ???

আর্য কোনো জনজাতি ছিল না। আর্য মানে কোনো জাতি নয়, ‘ব্যবহারে যে মহান’ তাকে আর্য বলা হতো। সাধারণত ক্ষত্রিয় রাজাদের আর্যপুত্র বলে সম্বোধন করা হতো। অনেকে আর্য মানে একটি উচ্চ পদকে বুঝিয়েছেন। ভারতের আদি নাম আর্যাবর্ত। ম্যাক্স মুলার আর্য বলতে ভাষা ভিত্তিক শ্রেণী বুঝিয়েছেন, জনজাতি হিসাবে নয়।

আর্য বলতে জীবন যাপনের শৃঙ্খলাবদ্ধ পদ্ধতিকে বোঝানো হয়েছে, বেশির ভাগ আধুনিক পণ্ডিত এই মতবাদ মেনে নিয়েছেন। তাই ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র আর্যদের বর্ণবিভাগ। ‘অন্ত্যযশ’ বলে একটি উপজাতিকে আর্য বলা হচ্ছে না কারণ তারা আর্যদের এই জীবন যাপন পদ্ধতি মেনে চলতো না। অথর্ব বেদে অনার্যদের ‘ব্রাত্য’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ যাদের কোনো পুজোর রীতিনীতি ছিল না।

সমগ্র ঋক বেদে ‘আর্য’ শব্দটি কখনোই একটি জনজাতিকে বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়নি। যদি আর্যরা বিদেশী, আলাদা একটি জনজাতি হতো, তবে তারা নিজেদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক আবদ্ধ রাখতো নিজেদের বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে। কিন্তু আর্য অনার্যদের মধ্যে বিবাহ খুব সাধারণ ছিল।

 

বর্ণবিভাগ প্রথায় চারটি বর্ণ ছিল। বর্ণ এখানে জীবিকা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছিল। কিন্তু যেহেতু ‘বর্ণ’ মানে রঙ, তাই ইউরোপীয় পণ্ডিতরা রঙ অর্থে ব্যবহার করলো। দুটি বর্ণ বা রঙের কথা বলা হলো, সাদা ও কালো। প্রথম তিনটি বর্ণ সাদা ও শেষ বর্ণ কালো হয়ে গেলো। আর ভারতীয়দের আসল রঙ বাদামী অনুল্লিখিত থেকে গেলো। সব কিছু আরোপিত, কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছিল না। ঋক বেদে ‘অনাস’ বলে এক জাতির উল্লেখ আছে। ‘অনাস’ এর মানে ‘নাক নেই’ বলে ধরে নেওয়া হয় কারণ আর্যরা ‘উন্নত নাসা’ ছিল। কিন্তু বর্তমানে প্রমাণিত ‘অনাস’ মানে যারা ঠিক ভাবে কথা বলতে পারতো না।

আর্যরা যদি সাদা হতো তবে ভগবান বিষ্ণু, কৃষ্ণ কখনো কালো হতেন না। মহানায়ক অর্জুন কালো, দ্রৌপদীর আর এক নাম কৃষ্ণা মানে কালো। মহাভারতের মত মহাকাব্যের রচয়িতা বেদব্যাস কুরূপ ছিলেন। তিনি অতি অবশ্যই কোনো সাদা সাহেব হতেন।

খ্রীঃ পূঃ 1500 সালে ইউরোপ থেকে কোনো জনজাতি ভারতে প্রবেশ করেনি। ওই সময় বড় কোনো অভিপ্রয়াণের কোনো প্রমাণ কোথাও পাওয়া যায়নি। প্রায় এক লক্ষ বছর আগে আফ্রিকা থেকে ভূমধ্যসাগরে স্থানান্তরিত হবার প্রমাণ আছে। সেখান থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করে তারা। কিন্তু এই প্রক্রিয়া আনুমানিক 60000 বছর আগে হয় এবং তার পরে আর কোনো জনজাতির অনুপ্রবেশ ভারতে ঘটেনি। আফ্রিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর সমন্বয়ে এক পৃথক ভারতীয় জনজাতির উন্মেষ ঘটে। নৃতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া গেছে যাতে পরিষ্কার হয়ে যায় যে 60000 বছর ধরে ভারতে অন্য কোনো বড় মাপের বহিরাগত জনজাতি আসেনি। নৃতত্ত্ববিদ ডঃ বি এস গুহ প্রাগৈতিহাসিক মানব কঙ্কাল ও আজকের কঙ্কাল গবেষণা করে প্রমাণ করেছেন যে ভারতীয় জাতিতে মোট ছয় রকম জাতির মিশ্রন ঘটেছে।

 

1. Negrito 2. Proto – Australoid 3. Mongoloid 4. Mediterranean 5. Western Brachycephate 6. Nordic

পরবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে খুব বড় সংখ্যায় মানুষ স্থানান্তরিত হয়ে ইউরোপে চলে যায়। আর তাই ভাষাগত সাদৃশ্য দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ ইউরোপের সভ্যতা ভারতীয় সভ্যতার অবদান বলা যেতে পারে।

‘বৈদিক সভ্যতা হরপ্পা সভ্যতার পরবর্তী পর্যায়’

আর্যরা যদি বাইরে থেকে না আসে তাহলে এরা কারা? আর কোথা থেকেই বা এলো? আর্যরা কোথাও থেকে আসেনি। বিগত প্রায় 60000 বছর ধরে তারা ভারতীয় উপমহাদেশেই বসবাস করছিল প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ধীরে ধীরে বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে তারা পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ও উন্নত সভ্যতা তৈরি করেছিল, সেটা হলো সিন্ধু সভ্যতা বা হরপ্পা সভ্যতা।

হরপ্পা সভ্যতার অনেক ধ্বংসাবশেষ বিগত কয়েক বছরে উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে খনন কার্যের ফলে পাওয়া গেছে। প্রতিটা শহরের ডিজাইন, প্ল্যানিং, লে আউট সব এক। এক রকম নিকাশী ব্যবস্থা, খাদ্যশস্য ভাণ্ডার, স্নানাগার, বড় বড় প্রাসাদ, সব শহরেই পাওয়া গেছে। খ্রীঃ পূঃ 2600 সালে মেসোপটেমিয়ার সাথে হরপ্পার বাণিজ্যের প্রমাণ পাওয়া গেছে। হরপ্পার সীলমোহর, গয়নার যে রকম নমুনা পাওয়া গেছে, একে তাই কোনো বিচ্ছিন্ন সভ্যতা না বলে এক সুশাসিত সাম্রাজ্য বলা উচিত হবে। সাম্রাজ্য অর্থাৎ কোনো কেন্দ্রীয় সংগঠিত শক্তিশালী শাসক ছাড়া এত নিয়ম মেনে সব কিছু করা সম্ভব ছিল না। সেক্ষেত্রে এমন এক সাম্রাজ্য এক যাযাবর গোষ্ঠীর হঠাৎ আক্রমণে ধ্বংস হয়ে গেলো, সেটা অসম্ভব।

 

হরপ্পা সভ্যতার ধ্বংস প্রধানতঃ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য হয়েছিল। মহেঞ্জোদারো শহরেই 3 বার ভীষণ বন্যার প্রমাণ পাওয়া গেছে। যদিও মহেঞ্জোদারো অনেক উঁচুতে অবস্থিত ছিল। কিন্তু নীচু জায়গা সব সম্পূর্ণ রূপে জলের তলায় জলে যাওয়া স্বাভাবিক ছিল, আর সেই সব জায়গার খোঁজ এখন পাওয়া যাচ্ছে। কাজেই পালিয়ে যাওয়া ছাড়া নাগরিকদের কাছে আর কোনো উপায় ছিল না। গুজরাটের লোথাল একটা বড় বন্দর শহর ছিল। জল দিয়ে ঘিরে যেখানে নোঙ্গর ফেলা হতো, আজো একি রকম আছে। বড়সড় কোনো আক্রমণ হলে সব ধ্বংসস্তুপে পরিণত হতো। এখনো পর্যন্ত হরপ্পা সভ্যতার কোনো জায়গায় আক্রমণের কোনো চিহ্ন নেই। কাজেই বন্যা ছাড়া ধ্বংসের অন্য কারণ ছিল বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন না।

সরস্বতী নদী খুব বিশাল ছিল যা শুকিয়ে যায়। সিন্ধু নদী তার গতিপথ পরিবর্তন করে। এদের প্রকৃত কারণ এখনো অজানা। এই সব জায়গার মাটি লবণাক্ত হয়ে যায়। রাজস্থান মরুভূমিতে পরিণত হয়। সরস্বতী নদী শুকিয়ে যাবার পর মানুষ পূর্বে সরে আসে গঙ্গা যমুনা অববাহিকায়। পুরাতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায় এই সময় পশ্চিম থেকে পূর্বে সরে আসার। খ্রীঃ পূঃ 1900 এর পরে মেসোপটেমিয়ার সাথে আর কোনো বাণিজ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় যে শাসন ছিল তা দুর্বল হয়ে যায়। অর্থনীতিও ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানুষ বেকার হয়ে যায়। পরবর্তী কালের হরপ্পা শহরে আগের মত নগর পরিকল্পনার ছাপ পাওয়া যায়নি। বড় বড় বাড়ির বদলে ছোট ছোট বাড়ি পাওয়া যায়। শিল্পের অবনতি, নিকাশী ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যায়। অর্থাৎ প্রশাসন দুর্বল হয়ে যাচ্ছিল। বড় শহর বন্যায় ধ্বংস হয়ে গেলো। ছোট শহরে মানুষের ভিড় বেড়ে গেলো। কাজের অভাব, খাদ্যের অভাব হলো কারণ জমি সব অনুর্বর হয়ে যায় বন্যার জন্য। কাজেই মানুষ উর্বর জমির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলো।

 

1995 থেকে 98 সালে মেহেরগড়, নৌশারো এবং পিরাকে ব্যাপক খননকার্য চলে। এই জায়গাগুলো প্রমাণ করে যে উন্নত শহুরে হরপ্পা সভ্যতা থেকে কিভাবে গ্রাম্য সভ্যতায় পরিণত হলো। খ্রীঃ পূঃ 1900 থেকে খ্রীঃ পূঃ 1300 সাল এই জন্য পরবর্তী হরপ্পা সভ্যতা বলা হয়।

নাগরিক মানুষ অবস্থার বিপাকে পড়ে গ্রামীণ হয়ে গেলেও সংস্কৃতি কিন্তু নষ্ট হয়ে যায় না। রীতিনীতি হারিয়ে যায় না। ধীরে ধীরে শুধু বিবর্তন হয়েছে মাত্র সময়ের সাথে সাথে। হরপ্পা সভ্যতার ওজন ও পরিমাপের পদ্ধতি গুপ্ত যুগেও পাওয়া যায়। বর্তমানে আমরা যে জগ, গরু বা পশু টানা গাড়ির অংশ, চিরুনি ব্যবহার করি, সেগুলো হরপ্পা সভ্যতার সময়েও ব্যবহৃত হতো।

1790 সালে জন প্লেফেয়ার একটি হিসাব কষে বলেন যে হিন্দু জ্যোতির্বিজ্ঞানের শুরু খ্রীঃ পূঃ 4300 তে। বৈজ্ঞানিক ভাবে এই তথ্যের বিরোধিতা কেউ করেনি। কিন্তু বেন্টলে যে অযৌক্তিক অবাস্তব কারণ দেখান, সেটা সম্পূর্ণ ধর্মীয় গোঁড়ামি। যেহেতু খ্রীঃ পূঃ 4000 এর আগের সময় বাইবেলের সময়পঞ্জী বহির্ভূত, তাই ব্যাখ্যা হলো না।

আসলে ঋক বৈদিক সাহিত্য অনুযায়ী এই অঞ্চলে কোনো বহিরাগত আক্রমণকারী আসেনি। বরঞ্চ বলা যায় যে দেশীয় সভ্যতার মৌলিক পুনর্গঠন হয়েছিল মাত্র।

 

ইউরোপীয় পণ্ডিতরা যে ঋক বেদের রচনাকাল খ্রীঃ পূঃ 1500 ধরেছিলেন, সেটাও কিন্তু গোড়াতেই ভুল হয়েছে। কারণ বেদ ‘শ্রুতি’। অর্থাৎ বহু বছর ধরে প্রচলিত এই বেদ যা মানুষ শুনে মনে রেখে এসেছে। সেক্ষেত্রে কথ্য ভাষার পরিবর্তন হলেও শ্রুতি কিন্তু অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনা বেশী। অনেকে হরপ্পা সভ্যতার সাথে যজুর্বেদের মিল খুঁজে পেয়েছেন। আর ঋক বেদ হয়তো তার আগের সভ্যতায় তৈরি হয়েছিল, যখন সরস্বতী নদী প্রধান নদী ছিল।

আর ঠিক এখানেই শুরু হলো সব সমস্যার সূত্রপাত। কারণ ঋক বেদ ও অন্যান্য বৈদিক সাহিত্য পড়লে বোঝা যায় যে ভারতীয় সভ্যতা কতটা প্রাচীন। ভারতীয় সভ্যতা আসলে পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতা। ইউরোপীয় সভ্যতা, সাহিত্য, বিজ্ঞান ভারতীয় সভ্যতার কাছে নিতান্তই শিশু হয়ে গেলো। কাজেই শুরু হলো কাটাছেঁড়া। অবৈজ্ঞানিক ভাবে প্রমাণিত হয়ে গেলো বৈদিক সভ্যতা ইউরোপীয় সভ্যতার অবদান। ভারতীয় ভাষা ইউরোপীয় ভাষা থেকে সৃষ্ট। ভারতীয় বিজ্ঞান, দর্শন গ্রীসের বিজ্ঞানের উপর প্রতিষ্ঠিত।

সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাবে আমরা, ভারতীয়রা এই তত্ত্ব আজো বিশ্বাস করি। আজো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউরোপীয় ঐতিহাসিকদের লেখা ইতিহাস পড়ানো হয়, তাদের অনুবাদ করা হিন্দু ধর্মগ্রন্থ পড়ানো হয়।

 

ভারতবর্ষ আজো তাদের ইতিহাসে ইউরোপের অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন করেনি। দয়ানন্দ সরস্বতী, ঋষি অরবিন্দ বা বাল গঙ্গাধর তিলকের মত হাতে গোনা কয়েক জন ছাড়া সেই সময় এর বিরুদ্ধে কেউ কথা বলেনি। আজো আসমুদ্রহিমাচল মনে করে যে আর্যরা বহিরাগত আক্রমণকারী এবং তারা ইউরোপীয় বংশধর। এখনো খ্রীস্টান মিশনারীদের করা বেদের অনুবাদের উপর নির্ভর করে আমরা কথা বলি যেমন ম্যাক্স মুলার, গ্রিফিথ, মনিয়ের উইলিয়ামস, এইচ এইচ উইলসন ইত্যাদি। আজ যদি আমরা বাইবেলের অনুবাদ করে তার ইতিহাস নিজেদের মত করে বোঝাতে যাই, খ্রীস্টানরা মেনে নেবে কি?? আসলে হিন্দুরা হিন্দু ছাড়া সবাইকে বিশ্বাস করে এসেছে। আর নিজেদের নিম্ন মানের ভেবে ঘৃণা করে এসেছে। পরিণতি ভোগ তো করতেই হবে যতক্ষণ না স্বীয় মহিমান্বিত হয়ে সদর্পে নিজের আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।

সৌজন্যে © দেবযানী হালদার, KC Chowdhury from Russia

 

 

আর্যরা বহিরাগত নয়…. আর্য দ্রাবির বরং একক জনগোষ্ঠী (দেবযানী ঘোষ)দ্বিতীয় পর্ব ..।।।

আর্যরা বহিরাগত নয়….. আর্য দ্রাবির বরং একক জনগোষ্ঠী।। (দেবযানী ঘোষ) শেষপর্ব

Reference :

1. T. Kivisild et. al, Current Biology, Vol 9, No 22, pp 133-134

2. Ancient Cities of the Indus Valley Civilization, by Jonathan Mark Kenoyer, Oxford University Press, Karachi/American Institute of Pakistan Studies, 1998.

3. Myth of the Aryan Invasion of India by David Frawley

4. Koenaard Elst

5. Indian Gods and Kings, The Story Of A Living Past by Emma Hawkridge, Houghton Miffin Company 1935

6. Concise History of the World, An Illustrated Time Line by National Geographic

7. Racial Elements in the Population by Dr B S Guha