SCO: নতুন বিশ্বব্যবস্থার চালিকাশক্তি? ভারত ও বাংলাদেশের জন্য ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ

SCO

SCO: নতুন বিশ্বব্যবস্থার চালিকাশক্তি? ভারত ও বাংলাদেশের জন্য ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ একসময় বিশ্বজুড়ে একক পরাশক্তির দাপট ছিল, কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দ্রুত বদলাচ্ছে। ক্ষমতার ভারসাম্যে এমন এক নীরব ভূমিকম্প হচ্ছে, যা আপনার কল্পনাকেও হার মানাবে!  SCO-এর উত্থান না পশ্চিমের পতন?’ এই গভীর প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের একতরফা আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রাচ্যের এক নতুন জোট কি তৈরি হচ্ছে? এর কেন্দ্রে কারা? আর ভারত-বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর ভবিষ্যৎই বা কী? বিশ্বজুড়ে এই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট কী, কীভাবে এই শক্তিশালী জোটের জন্ম হলো এবং এটি কীভাবে পশ্চিমা বিশ্বের রাতের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে, তা নিয়েই আমাদের আজকের আলোচনা।

সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (SCO): ইতিহাস ও বিবর্তন

সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (SCO) কেবল একটি আঞ্চলিক জোট নয়, এটি উদীয়মান নতুন বিশ্বব্যবস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। এর ইতিহাস খুব বেশি পুরনো নয়। ১৯৯৬ সালে ‘সাংহাই ফাইভ’ হিসেবে চীন, রাশিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান এবং তাজিকিস্তানের হাত ধরে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। সেই সময় এর প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল মধ্য এশিয়ার সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। ১৯৯৯ সালে, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলাকে মূল এজেন্ডা হিসেবে ঘোষণার পর এই জোট নতুন মাত্রা পায় এবং এর কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ে।

এরপর ২০০১ সালে, উজবেকিস্তানের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে ‘সাংহাই ফাইভ’ পরিণত হয় সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন বা SCO-তে। বর্তমানে এর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর তালিকায় আছে চীন, রাশিয়া, ভারত, পাকিস্তান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান এবং উজবেকিস্তান। সম্প্রতি, ইরানও পূর্ণ সদস্য হিসেবে এই জোটে যুক্ত হয়েছে। এর বাইরেও পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র এবং সংলাপ অংশীদারদের তালিকা আরও দীর্ঘ। পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা এবং প্রায় এক-চতুর্থাংশ বৈশ্বিক জিডিপি ধারণকারী এই জোট এখন ভূ-রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে পশ্চিমা বিশ্বের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

কেন এই জোট তৈরি হলো? প্রধান সদস্যদের কৌশলগত উদ্দেশ্য

এই শক্তিশালী জোটের সদস্যরা কেন একসাথে হাত মেলাচ্ছে? এর পেছনের কৌশলগত উদ্দেশ্যগুলো প্রতিটি দেশের নিজস্ব স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত।

চীনের উদ্দেশ্য: চীনের জন্য, SCO তার উচ্চাভিলাষী ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI)-এর সফল বাস্তবায়নে এক কৌশলগত প্ল্যাটফর্ম। মধ্য এশিয়ায় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বিস্তার এবং পশ্চিমা বিশ্বের একতরফা আধিপত্য খর্ব করা চীনের অন্যতম মূল উদ্দেশ্য। SCO-এর মাধ্যমে চীন পশ্চিমা শক্তির মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ একটি কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে এবং তার বিশ্বব্যাপী প্রভাব বাড়াতে সক্ষম হচ্ছে।

রাশিয়ার উদ্দেশ্য: ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং একঘরে করার প্রচেষ্টার মুখে রাশিয়া SCO-কে একটি বিকল্প মিত্র জোট হিসেবে দেখছে। মধ্য এশিয়ায় তার ঐতিহ্যবাহী প্রভাব ধরে রাখা এবং চীন ও ভারতের সাথে সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা রাশিয়ার জন্য অপরিহার্য। এটি পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক পাল্টা শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, যা রাশিয়ার আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কমাতে সাহায্য করছে।

ভারতের উদ্দেশ্য: ২০১৫ সালে SCO-তে ভারতের পূর্ণ সদস্যপদ গ্রহণ একটি অত্যন্ত জটিল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ ছিল। একদিকে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে QUAD-এর মতো সামরিক জোট, অন্যদিকে SCO-তে চীনের মতো আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী এবং রাশিয়ার মতো পুরনো মিত্রদের উপস্থিতি ভারতকে এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের খেলায় নিযুক্ত করেছে। ভারতের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ নীতির অংশ হিসেবে, কোনো একক ব্লকের উপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করাই এর মূল উদ্দেশ্য। SCO ভারতকে মধ্য এশিয়ার বিশাল জ্বালানি সম্পদে প্রবেশাধিকার এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির সুযোগ দেয়, যা ‘নর্থ-সাউথ করিডর’ (INSTC) এর মতো প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সংযোগ বাড়াতে সহায়ক।

SCO বনাম পশ্চিম: এক নতুন বিশ্বযুদ্ধের ইশারা?

প্রশ্ন হলো, SCO কি কেবল একটি আঞ্চলিক জোট, নাকি এটি ন্যাটোর মতো পশ্চিমা জোটের বিরুদ্ধে এক নতুন বিশ্বচক্র বা শীতল যুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে? SCO সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সামরিক অনুশীলন বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক জোট হিসেবে এর বিকাশ, এমনকি নিজস্ব মুদ্রা বা পেমেন্ট সিস্টেম নিয়ে আলোচনা—এগুলো সবই পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষত আমেরিকাকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

আসন্ন SCO সম্মেলনগুলো এই জোটের শক্তি প্রদর্শনের এক নতুন মঞ্চ হয়ে উঠছে। যেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন এবং চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং-এর মতো প্রভাবশালী নেতারা একই মঞ্চে এসে দাঁড়াচ্ছেন। এই সমাবেশ কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক আলোচনা নয়, এটি পশ্চিমা বিশ্বের, বিশেষত আমেরিকার, একতরফা আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক স্পষ্ট কৌশলগত বার্তা এবং নতুন ক্ষমতার বিন্যাসের এক জোরালো ইঙ্গিত। তারা আশঙ্কা করছে, এই জোট বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। এটি কেবল একটি ভূ-রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস নয়, বরং বিশ্বকে একটি নতুন, বহু-মেরুকেন্দ্রীক ব্যবস্থায় নিয়ে যাওয়ার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি। বিশ্ব কি সত্যিই দুইটি সুস্পষ্ট ব্লকে বিভক্ত হচ্ছে? এর সম্ভাব্য পরিণতি কী? এই প্রশ্ন আজ আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।

ভারত ও বাংলাদেশের জন্য SCO: সুযোগ না বিপদ?

এই নতুন ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারত এবং বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য কী অপেক্ষা করছে? এটা কি তাদের জন্য নতুন সুযোগ, নাকি বিপদ?

ভারতের জন্য: SCO ভারতকে তার সামরিক স্বাধীনতা রক্ষা করতে এবং অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা বাড়াতে সুযোগ দিচ্ছে। এটি মধ্য এশিয়ার সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করে ভারতের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। তবে, এর ভেতরেই চীন ও পাকিস্তানের সাথে বিদ্যমান সম্পর্কের জটিলতা ভারতের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। দিল্লিকে সতর্কতার সাথে এই ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে, যাতে তার জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে এবং কোনো পক্ষের সাথে বিরোধ আরও তীব্র না হয়।

বাংলাদেশের জন্য: বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য SCO-এর উত্থান নতুন সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ উভয়ই তৈরি করছে। যদিও বাংলাদেশ বর্তমানে SCO-এর পূর্ণ সদস্য নয়, এটি সংলাপ অংশীদার (Dialogue Partner) হতে আগ্রহী। এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনে এর প্রভাব অনিবার্য। SCO-এর মাধ্যমে আঞ্চলিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং সংযোগ আরও বাড়তে পারে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন গতি দেবে। চীনের BRI প্রকল্পের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই বড় বিনিয়োগ গ্রহণ করছে, যা SCO-এর বৃহত্তর অর্থনৈতিক করিডোরের সাথে সংযুক্ত হতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে। তাছাড়া, বাংলাদেশ সবসময়ই একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে আসছে। SCO-এর উত্থান বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার অবস্থানকে আরও সুসংহত করার সুযোগ করে দিতে পারে। পশ্চিমা বিশ্বের বাইরেও বিকল্প অর্থনৈতিক ও কৌশলগত জোটের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশ তার বৈশ্বিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় SCO-এর সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য বাড়তি সুবিধা দেবে, যা আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।

শেষ কথা

SCO-এর উত্থান কেবল ভূ-রাজনৈতিক শক্তির পুনর্বণ্টন নয়, এটি নতুন এক বিশ্বব্যবস্থার সূচনালগ্ন। যেখানে প্রতিটি দেশকেই এখন তাদের কৌশলগত অবস্থান বেছে নিতে হবে। বিশ্ব আর আগের মতো থাকবে না। এই জটিল ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আপনার মতামত কী? কমেন্ট বক্সে আমাদের জানান। @D-Box360 চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন এবং বেল আইকনটি টিপে রাখুন, কারণ আমরা সর্বদা সত্যের প্রতিটি দিক উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

 

ভারতীয় CEO : বিশ্ব শাসনে কি ভারতীয়দের স্বর্ণযুগ চলছে? ভারতীয় মস্তিষ্কের বিশ্বজয়!

Scroll to Top