‘0’ মানেই ‘শূন্য’ নয়। ফিরে দেখা আমাদের অবদান।

3_প্রশ্ন (ক) রবিনের কাছে মোট ৩টি ফাউন্টেনপেন ছিল , ২টি ফাউন্টেনপেন সে শিপনকে দিল, রবিনের কাছে এখন কয়টি ফাউন্টেনপেন আছে ?
উত্তর (ক): ১টি । 
প্রশ্ন (খ) অবশিষ্ট ১টি ফাউন্টেনপেন সে নিলাদ্রীকে  দিল, রবিনের কাছে এখন কয়টি ফাউন্টেনপেন আছে ?উত্তর(খ) : ১টিও নেই / কিছুই নেই
প্রাচীন
গ্রীকের কাউকে জিজ্ঞেস করলে প্রশ্ন খ’ এর উত্তর তাঁরাও এমনটাই দিতেন !
কেননা ‘কিছুই নেই’ অর্থাৎ বাস্তবে না থাকা কোন কিছু কে  ‘সংখ্যা’ দ্বারা
প্রকাশ করবার সংখ্যাটি গ্রীক গণিতবিদেরা তখনও আবিষ্কার করতে পারেন নি। অথচ
আপনাকে জিজ্ঞেস করলে আপনি কিন্তু এখন অনায়াসে বলে দিতে পারছেন ‘প্রশ্ন (খ)’
এর সম্পূর্ণ উত্তর হচ্ছে  – “রবিনের কাছে এখন  ‘শূন্য’ কিংবা ‘জিরো’
সংখ্যক ফাউন্টেনপেন আছে”।


আরবি শব্দ “সাফাইর” বা “সাফাইরা” এই
শব্দটির মানেও হচ্ছে “সেখানে কিছু ছিল না”। ধারনা করা হয় এই শব্দটি থেকেই
উদ্ভূত হয় ইতালীয় জিফাইরো /জেফিরো কিংবা zefiro  শব্দটি,  আর ফ্রান্সে
শব্দটি রূপান্তরিত হয়  zéro তে এবং সেখান থেকেই ইংরেজিতে তা হয়ে যায়
‘zero’।

জানা যায় মাত্র ১৫৯৮ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজরা কাগজে কলমে ‘zero’ জিরো শব্দটি প্রথম বারের মতো ব্যবহার করেন। অথচ ইংরেজিতে ‘zero’ জন্মাবার এক হাজার বছর আগেই ভারতবর্ষে জন্ম নিয়ে নেয় ‘zero’
র আদিরূপ, তা শুধুমাত্র একটি শব্দ হিসেবে নয়, জন্ম নেয় গণিতে একটি
গুরুত্বপূর্ণ  সংখ্যা হয়ে। ভারতীয় সংস্কৃত ভাষায় যার  নাম হয়েছিল
 শ্যুন্যেয়া বা ‘শূন্য’  । 
আর্যভট্ট (৪৭৬ – ৫৫০) , বিবেচনা
করা হয় তিনি  প্রাচীন ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত গণিতবিদদের একজন ।
তিনিই সর্বপ্রথম দশ ভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতি কিংবা  ডেসিম্যাল নিউম্যারেল
 সিস্টেম  সম্পর্কে ধারনা দিয়ে যান , বলেছিলেন  ‘স্থানম স্থানম দশ গুণম’  ধারনা
করা হয়ে থাকে , এই  কথা দিয়ে  তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, স্থানে স্থানে দশ
গুণের কথা।  পরবর্তী কালে ‘আর্যভট্ট’র সূত্র সমূহ’র উপর ভিত্তি করেই  গণিতে
আধুনিক ডেসিম্যাল পদ্ধতি টি বিকাশ লাভ হয়।

1

ব্রহ্মগুপ্ত (৫৯৮-৬৬৬) ,
ভারতীয় বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গণিতপন্ডিত । উত্তর পশ্চিম রাজস্থানের
ভিনমাল (তৎকালীন ভিল্লামা) শহরে জন্মগ্রহন করেন তিনি । অনেক সময় তাঁকে
ভিল্লামাচারিয়া (ভিল্লামার শিক্ষক) বলে ডাকা হত। তিনি ছিলেন তখন
উজ্জ্বয়িনী মানমন্দিরের প্রধান। সেই সময়কালেই তিনি গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যার
উপর চাদামেক্‌লা, ব্রহ্মস্ফুট সিদ্ধান্ত, খণ্ডখদ্যকা এবং দুরকেয়ামান্দ্রা
এই শিরোনামে চারটি বই রচনা করেন। তন্মধ্যে ‘ব্রহ্মস্ফুট সিদ্ধান্ত’ অর্থাৎ
ব্রহ্মর সংশোধিত নীতিমালা এই বইটি ছিল সবচেয়ে বিখ্যাত । বলা হয়ে থাকে
পন্ডিত  ব্রহ্মগুপ্তই  প্রকৃত রূপে ‘কোন কিছুই না থাকা’-কে গণিত দ্বারা
সংজ্ঞায়িত করেন সর্বপ্রথম। বলেন  ‘কিছুই নেই’ এই শূন্যাবস্থাটিও প্রকৃত
রূপে একটি অনন্য সংখ্যা ভিন্ন আর অন্য কিছুই নয় । তারপর  থেকেই ‘শূন্য’ একটি সংখ্যা হিসেবে গণিত বিদ্যায় সংযোজিত হয়।

2

মেসোপটেমীয়ান সভ্যতায় ‘শূন্য’ বোঝাতে দুই
ক্লিক (“) চিহ্ন ব্যবহারের নিদর্শন পাওয়া যায়। কিছু ক্ষেত্রে ‘শূন্য’
বোঝাতে সংখ্যা ঘরে স্থানটি ফাঁকা রেখে তা বোঝানো হতো , একসময় শুধু মাত্র
একটি বিন্দু দ্বারাও তাকে প্রকাশ করা হয়েছিল , কালক্রমে সংখ্যাটি একটি
ডিম্বাকৃতি বৃত্ত’র রূপ পরিগ্রহ করে , বর্তমানে তা ‘0’ এই চিহ্ন দ্বারা অমরত্ব লাভ করেছে।

‘শূন্য’ সম্পর্কিত ‘ব্রহ্মগুপ্ত’র সিদ্ধান্ত সমূহ:

ক। যোগ সম্পর্কে বলেছেন:
The sum of
zero and a negative number is negative, the sum of a positive number and
zero is positive; the sum of zero and zero is zero.
শূন্য এবং নেগেটিভ সংখ্যার যোগফল নেগেটিভ, শূন্য এবং পজিটিভ সংখ্যার যোগফল পজিটিভ, শূন্য এবং শূন্য’র যোগফল শূন্য।
খ। বিয়োগ সম্পর্কে বলেছেন:
A negative
number subtracted from zero is positive, a positive number subtracted
from zero is negative, zero subtracted from a negative number is
negative, zero subtracted from a positive number is positive, zero
subtracted from zero is zero.
শূন্য থেকে নেগেটিভ সংখ্যার বিয়োগফল পজিটিভ
, শূন্য থেকে পজিটিভ সংখ্যার বিয়োগফল নেগেটিভ, নেগেটিভ সংখ্যা থেকে
শূন্য’র বিয়োগফল নেগেটিভ , পজিটিভ সংখ্যা থেকে শূন্য’র বিয়োগফল পজিটিভ ,
শূন্য থেকে শূন্য’র বিয়োগফল শূন্য।

‘শূন্য’ সম্পর্কিত ‘গুণ’ এবং ‘ভাগ’ বিষয়ে
‘ব্রহ্মগুপ্ত’ সুস্পষ্ট করে তেমন কিছুই বলে যান নি । এই বিষয়ে বিস্তারিত
পাওয়া  যায় ভারতীয় আরেক গণিত লিজেন্ড  দ্বিতীয় ভাস্কর
(১১১৪-১১৮৫)  এর রচনা গুলোতে । দ্বিতীয় ভাস্করই  সর্বপ্রথম নেগেটিভ ও
পজিটিভ সংখ্যার  আচরণ সম্পর্কে ধারনা প্রদান করে যান । দ্বিতীয়
ভাস্করের  মূল তত্ত্বকথা :

ঋণাত্মক সংখ্যাকে ঋণাত্মক সংখ্যা দ্বারা গুন করলে ফলটি হবে ধনাত্মক ।
ঋণাত্মক সংখ্যাকে ধনাত্মক সংখ্যা দ্বারা গুন করলে ফল হবে ঋণাত্মক।
শূন্য সম্পর্কিত  গুণ এবং ভাগ বিষয়ে তিনি বলেন:
১। ‘শূন্য’ দিয়ে কোন সংখ্যাকে গুণ করলে গুণফল ‘শূন্য’ ‘ হবে।
২। ‘শূন্য’ কে কোন সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে ভাগফল  ‘শূন্য’ হবে।

কিন্তু ‘শূন্য’ দিয়ে কোন সংখ্যাকে ভাগ করলে ভাগফল কী হবে ?

ধরা যাক ,    a =b
‘a’ দ্বারা গুণ করে,   a2= ab
a2 – 2ab যোগ করে,   a2 + a2 – 2ab = ab + a2 – 2ab
2a2 – 2ab = a2 – ab
2(a2 – ab) = (a2 – ab)
(a2 – ab) দিয়ে ভাগ করে,   2= 1

যেহেতু a = b , তাই a2 – ab =0 , অতএ  ‘শূন্য’ দিয়ে দুই পক্ষকে ভাগ করার কারণেই জন্ম হয়েছে এই প্যারাডক্স ।

আরও একটু সহজ করে যদি বলা হয়  , ধরা যাক 15/ 0 = Y অর্থাৎ 0 X Y= 15 তার
মানে ‘Y’ এর মান 9 , 16 , 501 যা খুশী হোক ,কোন কিছুতেই 0 X Y= 15 হবে না।

অর্থাৎ  কোন সংখ্যাকে ‘শূন্য’ দিয়ে ভাগ করলে  তার  ফলাফল হবে ‘অনির্দিষ্ট’ ।

হিন্দু-আরবি সংখ্যা পদ্ধতি: Hindu–Arabic numeral system

আনুমানিক (৭৫৪ – ৭৭৫) সালে আব্বাসীয় বংশের
দ্বিতীয় খলিফা আল মনসুর , টাইগ্রিস নদী তীরে পত্তন করেন বাগদাদ নগরী । তাঁর
একান্ত ইচ্ছা এই বাগদাদ নগরী একদিন হয়ে উঠবে  জ্ঞান বিজ্ঞানের এক সমৃদ্ধ ও
শক্তিশালী  চর্চা কেন্দ্র । ৭৭০ সালে তিনি ‘উজ্জাইন’ থেকে ‘কংকা’ নামের এক
ভারতীয় পণ্ডিতকে বাগদাদে আমন্ত্রণ জানান। ‘কংকা’ একটি বই থেকে গাণিতিক
জ্যোতির্বিদ্যার ভারতীয় পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেন। খলিফার দরবারে তখন
উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট  গণিতজ্ঞ ,  দার্শনিক ও জ্যোতির্বিদ ‘মুহাম্মদ আল ফাজারী’
। ‘কংকা’ যেই বইটি নিয়ে এসেছিলেন  সেই বইটি আরবিতে অনুবাদ করার জন্য তিনি
খলিফা দ্বারা নির্দেশিত হন । খলিফার নির্দেশে ‘আল ফাজারী’  সেটি আরবিতে
অনুবাদ করেন। বইটির নাম দেন “জিজ-আল সিন্ধিন্দ” (সিন্ধিন্দ মানে সিদ্ধান্ত)
। আবু রায়হান আল বিরুনী (৯৭৩-১০৪৮) তাঁর  ‘তারিখ আল হিন্দ’ (ভারতীয়
ইতিহাস) বইটিতে এই তথ্যটি উল্লেখ করেন । তাঁর ধারণা অনুবাদ কৃত সেই বইটিই
ছিল বিখ্যাত ভারতীয় পণ্ডিত ব্রহ্মগুপ্তের লেখা ‘ব্রহ্মস্ফুট সিদ্ধান্ত’।

5

৯ম শতকের শুরুর দিকে  (৭৮০ – ৮৫০) বাগদাদের
খলিফা আল-মামুনের  লাইব্রেরিতে , প্রধান লাইব্রেরিয়ান হিসাবে যোগ দেন
তুখোড় গণিত জ্ঞানসম্পন্ন এক যুবক । তাঁর নাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে
মূসা /মুসা আল খোয়ারিজমি । সেখানেই বিজ্ঞান ও গণিত চর্চায়
গভীর ভাবে মনোনিবেশ করেন  তিনি । অনুবাদ করেন গ্রীক ও সংস্কৃত ভাষায় রচিত
অনেক বৈজ্ঞানিক ও গণিত গ্রন্থ । ভারতীয় উপমহাদেশে গণিতের মৌলিক
অপারেশনগুলি যেমন- যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ, ইত্যাদির ব্যবহার দ্বারা গণিত
সম্পাদনের পদ্ধতি –যা ছিল মূলত পাটীগণিত ততদিনে তার
ব্যাপক সমৃদ্ধি সাধিত হয়েছিল বটে ,  কিন্তু যেখানে গাণিতিক সমীকরণে অজানা
সংখ্যাকে প্রতীকের মাধ্যমে উপস্থাপন করে গণিত সম্পাদন করা হয় – অর্থাৎ যা ‘বীজগণিত’
, সেটি তখনও ছিল অপরিপূর্ণ। কোন গাণিতিক সম্পর্ককে সাধারণ সূত্রের আকারে
পাটীগণিতের সাহায্যে প্রকাশ করা সম্ভব ছিল না । কিন্তু বীজগণিতে প্রতীকের
সাহায্যে কোন গাণিতিক সম্পর্ক একটি সাধারণ বিবৃতি আকারে প্রকাশ করা সম্ভব
ছিল। ‘মুসা আল খোয়ারিজমি’র হাত ধরেই শুরু হয় বীজগণিতের
যুগ। তাই তাঁকে বীজগণিতের জনক বলা হয়ে থাকে। প্রায় ১৫ বছর ধরে ভারতীয় গণিত
বিদ্যার উপর ব্যাপক পড়াশুনা ও গবেষণা শেষে ‘মুসা আল খোয়ারিজমি’ আর্যভট্টের 
১০-ভিত্তিক/ ডেসিম্যাল সংখ্যা লিপিকে একটি সম্পূর্ণ রূপ প্রদান করেন । যা
বর্তমানে গণিতের বহুল প্রচলিত পরীক্ষিত পদ্ধতি হিসাবে ইউনিভার্সেলী ব্যবহৃত
হচ্ছে।
এই রীতি অনুযায়ী 7587 সংখ্যাটিকে ভেঙ্গে বিশ্লেষণ করলে তা দাঁড়ায়:

7587= 7 x 1000+ 5 x 100 + 8 x 10 +7 = 7x 103  + 5 x 102 + 8 x 10 +7

4

এই হিন্দু-আরবি গণনা পদ্ধতিটি সম্পর্কে বিশ্ব তখনও গভীর অন্ধকারে। অসাধারণ মেধাসম্পন্ন গণিতবিদ  লিউনার্দো ফিবোনাচ্চি
‘র পিতা ছিলেন ইতালির একজন বড় ব্যবসায়ী , সেই ব্যবসার সুবাদে ফিবোনাচ্চি
একদিন ভ্রমণ উদ্দেশ্যে আলজেরিয়ায় আসেন । আলজেরিয়ায় এসে  ‘তিনি হিন্দু-আরবি
গণনা পদ্ধতি’টি সম্পর্কে জানতে পারেন এবং তাতে ব্যাপক উদ্বুদ্ধ ও আগ্রহী
হন। পরবর্তীতে ইউরোপে ফিরে  তিনি এই সংখ্যা লিপির ধারনা সমূহ  নিয়ে রোমান
পণ্ডিত দের সাথে আলোচনা করেন । কিন্তু রোমান পণ্ডিতগণ এই পদ্ধতি নিয়ে
যথেষ্ট  আগ্রহী হন না  এবং তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান ।

রোমান দের সংখ্যা গণনার পদ্ধতি:

I for 1,  V for 5,  and  X for 10  সেই হিসাবে , IV = 4   
XV = 15 , VIII = 8 ,  XX = 20 ,  XIII = 13,  XXX = 30 . পঞ্চাশ লেখার
জন্য তাদের প্রয়োজন পড়ে ৫ টি X , তখন তারা সেটিকে প্রকাশ করেন ‘L’ দিয়ে ,
তদ্রূপ ১০০ কে ‘C’ এবং ১০০০ কে ‘M’ দিয়ে । ডেসিম্যাল পদ্ধতি অনুসরণ করে  33
এবং 22 যোগ করে সহজেই 55 লিখে ফেলা যায় , কিন্তু রোমানদের লিখতে হত
 XXXIII + XXII = LV , 1647  লিখতে গেলে তারা  লিখতে হতো  MDCXLVII .

অতঃপর বড়ো
সংখ্যা সাজাইয়া লিখিতে এবং ‘শূন্য’ ছাড়া অংক কষিতে , রোমান পণ্ডিতগণের
মাথার তার পুরাই ছিঁড়িয়া যাইবার উপক্রম হয় । দিন দিন সেই  প্রতিবন্ধকতা
বৃদ্ধি পাইয়া ক্রমশঃ জটিল হইতে জটিলতর হইতে থাকে ।  তাহারা চক্ষে দেখিতে
লাগেন অন্ধকার আর সরিষা ফুল । এইরূপ দিশেহারা অবস্থা হইতে উত্তরণের জন্য
রোমান পণ্ডিতগণের , তখনে দশ ভিত্তিক /ডেসিম্যাল সংখ্যা পদ্ধতি টি সাদরে এবং সহাস্যে  গ্রহণ করা ছাড়া আর বিকল্প কোন উপায় থাকে না।

সূত্রঃ উইকি
ব্রহ্মগুপ্ত  আর্যভট্ট  হিন্দু-আরবি সংখ্যা পদ্ধতি   খোয়ারিজমি

আরো দেখুন।