তিব্বতের ইতিহাস: স্বাধীনতা, দমন-পীড়ন এবং দালাইলামার পলায়ন

তিব্বতের ইতিহাস: স্বাধীনতা, দমন-পীড়ন এবং দালাইলামার পলায়ন

তিব্বত—হিমালয়ের কোলে এক রহস্যময় ভূখণ্ড, যার ইতিহাস একইসাথে গৌরবময়, নাটকীয় এবং বেদনাদায়ক। আজকের আলোচনায় আমরা তুলে ধরব তিব্বতের সেই জটিল ইতিহাস, চীনের সাথে এর অন্তর্ভুক্তি, দালাইলামার কিংবদন্তিসম পলায়ন এবং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশ।

প্রাচীন তিব্বত: একটি সমৃদ্ধ সাম্রাজ্যের উত্থান

সপ্তম থেকে নবম শতাব্দীর মধ্যে তিব্বত ছিল একটি বিশাল এবং শক্তিশালী সাম্রাজ্য। এর আয়তন ছিল প্রায় ২৫ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার। এই সময়েই ভারত থেকে বৌদ্ধ ধর্ম তিব্বতে প্রবেশ করে, গুরু পদ্মসম্ভব ও শান্তরক্ষিতের মতো মহাপুরুষদের মাধ্যমে। এই ধর্মীয় সঞ্চার তিব্বতের সংস্কৃতিকে নতুন মাত্রা দেয়।

৮২১ খ্রিস্টাব্দে তিব্বতের সাথে চীনের টাং সাম্রাজ্যের শান্তিচুক্তি হয়, যা সীমান্ত নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু এই শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

চীনের আধিপত্যের সূচনা

১৭২০ সালে চিং রাজবংশ তিব্বতের কিছু অংশ দখল করে নেয়। যদিও ১৯১২ সালে চিং সাম্রাজ্যের পতনের পর ত্রয়োদশ দালাইলামা স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং ১৯৫০ সাল পর্যন্ত তিব্বত কার্যত স্বাধীন থাকে। এই সময়ই ১৯১৪ সালে সিমলা কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ব্রিটেন ও তিব্বত স্বাক্ষর করলেও চীন তা প্রত্যাখ্যান করে।

চীনের “শান্তিপূর্ণ মুক্তি” নাকি দখল?

১৯৪৯ সালে চীনে কমিউনিস্ট বিপ্লব ঘটে। মাও সেতুং ক্ষমতায় এসে তিব্বতকে চীনের অংশ বলে ঘোষণা করেন। ১৯৫০ সালে পিপলস লিবারেশন আর্মি (PLA) তিব্বতে প্রবেশ করে, যার নাম দেওয়া হয় ‘তিব্বতের শান্তিপূর্ণ মুক্তি’। চামদো শহর দখলের মধ্য দিয়ে চীনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা পায়।

এর পরেই আসে ১৯৫১ সালের বিতর্কিত ১৭ দফা চুক্তি, যেখানে তিব্বতের প্রতিনিধি দলকে চাপ দিয়ে বেইজিং-এ সই করানো হয়। যদিও তাতে স্বায়ত্তশাসন, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও দালাইলামার মর্যাদা সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি ছিল, বাস্তবে তা মানা হয়নি।

তিব্বতের ইতিহাস
History of Tibet

দালাইলামার পলায়ন: প্রতিরোধের প্রতীক

১৯৫৯ সালে, দালাইলামাকে দেহরক্ষী ছাড়া একটি অনুষ্ঠানে ডাকার ঘটনাকে কেন্দ্র করে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় গণ-অভ্যুত্থান। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে, ১৭ই মার্চ রাতে দালাইলামা পোতালা প্রাসাদ থেকে ছদ্মবেশে পালিয়ে যান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন মা, ভাই-বোন এবং কিছু বিশ্বস্ত সহযোগী। কাহিনী বলে, CIA-এর কিছু সহায়তা ও প্রশিক্ষিত গেরিলারা তাঁকে নিরাপদে সীমান্ত পার করে দেন।

৩১শে মার্চ, দালাইলামা ভারতে প্রবেশ করেন এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু তাঁকে আশ্রয় দেন। এরপর ধর্মশালায় তিব্বতের নির্বাসিত সরকার গঠিত হয়, যা এখনও সক্রিয়।

সাংস্কৃতিক বিপ্লব ও দমন-পীড়নের ইতিহাস

চীনা দমন-পীড়নের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ দেখা যায় সাংস্কৃতিক বিপ্লব (১৯৬৬-১৯৭৬) কালে। হাজার হাজার বৌদ্ধ মঠ ধ্বংস হয়। তিব্বতিরা হারায় তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচিতি। বিভিন্ন তথ্য মতে, এই সময় অন্তত ১০ লক্ষ তিব্বতি নিহত হন বা অনাহারে মারা যান।

পরবর্তী দশকগুলোতেও ১৯৮৭, ১৯৮৯ এবং ২০০৮ সালে আন্দোলন হলেও সেগুলো কঠোরভাবে দমন করা হয়েছে।

তিব্বতের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য

তিব্বতের সংস্কৃতি বিশ্বে অনন্য। বহু-পতিত্ব, পদবীহীন নাম, এবং “আকাশ সমাধি” বা স্কাই বিউরিয়াল তাদের ধর্মীয় দর্শনের প্রতিফলন। মরদেহকে শকুনের খাবার হিসেবে ব্যবহারের এই প্রথা অনিত্যতা ও দেহদানের ধারণা বহন করে।

কৈলাশ পর্বত, শম্ভালা, ইয়েতির মতো রহস্যময় বিষয়গুলিও তিব্বতের আধ্যাত্মিক পরিচয়ের অংশ।

তিব্বতের ইতিহাস: ভূরাজনীতি ও সামরিক প্রসঙ্গ

তিব্বতি শরণার্থীদের নিয়ে গঠিত ভারতীয় বাহিনী “Special Frontier Force (SFF)” তিব্বতের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বকে আরও বাড়িয়েছে। অনেক সময় পশ্চিমা শক্তি তিব্বত ও তাইওয়ানকে চীনের উপর চাপ তৈরির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে।

ভবিষ্যতের প্রশ্ন: পরবর্তী দালাইলামা কে?

বর্তমান দালাইলামার বয়স প্রায় ৯০। তার মৃত্যুর পর কে হবেন পরবর্তী দালাইলামা—এটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বৌদ্ধ ধর্ম অনুযায়ী, পুনর্জন্মের মাধ্যমে নতুন দালাইলামাকে খুঁজে বের করার প্রথা রয়েছে। কিন্তু চীন এই প্রক্রিয়াকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। তাই ভবিষ্যতে দুটি ভিন্ন দালাইলামা দেখা যেতে পারে—একজন চীনের অনুমোদিত, আরেকজন নির্বাসিত তিব্বতিদের মনোনীত।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এবং জাতিসংঘের ভূমিকা

তিব্বতের ওপর চীনের দখলের পর আন্তর্জাতিক মহলে কিছু প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও, সেগুলো অনেকটাই প্রতীকী ছিল। ১৯৫৯ সালে ভারত দালাইলামাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিলেও, সরাসরি চীনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি। জাতিসংঘ তিব্বতের পরিস্থিতি নিয়ে কয়েকটি প্রস্তাব গ্রহণ করলেও, কোনও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তিব্বতের প্রতি আন্তর্জাতিক সহানুভূতি থাকলেও, চীনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক শক্তির কারণে অনেক দেশ সরাসরি সমালোচনায় পিছপা হয়েছে।

আধুনিক তিব্বত: উন্নয়ন না দমন?

চীন সরকার দাবি করে, তারা তিব্বতে ব্যাপক উন্নয়ন করেছে—সড়ক, রেল, হাসপাতাল ও শিক্ষাক্ষেত্রে। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এই উন্নয়নের আড়ালে চলছে সাংস্কৃতিক অবক্ষয় ও তিব্বতি পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টার। আধুনিক তিব্বত যেন দুই বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন—একদিকে উন্নয়ন, অন্যদিকে স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা।

উপসংহার

তিব্বতের ইতিহাস শুধু একটি অঞ্চল দখলের কাহিনী নয়, এটি এক জনগোষ্ঠীর পরিচয়, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি। দালাইলামার পলায়ন, চীনা আধিপত্য, সাংস্কৃতিক দমন—সব মিলিয়ে তিব্বতের ইতিহাস বিশ্ব রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠেছে। আগামী দিনে দালাইলামার উত্তরাধিকার ও তিব্বতের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে, যা গোটা বিশ্বের নজরে থাকবে।

Scroll to Top