একই বৃন্তে দুইটি কুসুম : হিন্দু-মুসলমান
——————————————

কথায় কথায় অনেকেই মাঝে মাঝে বলে থাকেন ইতিহাস বিস্মৃত জাতি কখনো উন্নতি করতে পারে না | কথাটা আপাতদৃষ্টিতে হালকা হলেও, এর অভ্যন্তরে গভীর মানে লুকিয়ে আছে | আচ্ছা বাঙালি কি আত্মবিস্মৃত জাতি, না বাঙালি জাতির ইতিহাস খন্ডিত ও বিকৃতভাবে পরিবেশিত ? ১৯৫০ এ আমার ঠাকুমার তার জন্মভূমি পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ববঙ্গ ত্যাগ করার পরিপ্রেক্ষিত সন্ধান করতে গিয়ে যে তথ্য পেয়েছি, তাতে আমি একটা ব্যাপারে নিশ্চিত, বাঙালির ইতিহাস খন্ডিত তো বটেই, এবং অর্ধসত্য | আমার এই ধারাবাহিক লেখাতে সেদিনের বাঙালি মুসলমানের অনেক গৌরবগাঁথার কথাই তুলে ধরেছি, পাঠক আজকে আপনাদের বলব সিলেটের অধ্যাপক যতীশচন্দ্র দাসের ১৯৫০ এ নির্মম অভিজ্ঞতার কথা :

অধ্যাপক যতীশচন্দ্র দাসের বাড়ি ছিল সিলেট | ১৯৫০ এ, যতীশচন্দ্র দাস, কিশোরগঞ্জ কলেজে দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন ২৫ শে জানুয়ারি | তিনি একটা বাড়ি কিশোরগঞ্জে ঠিক করে, সিলেটে ফেরত যান তাঁর পরিবারকে আনতে | সেটা ছিল ফেব্রুয়ারী মাসের ১০ তারিখ | ১২ তারিখ সকাল ৬ টায়, যতীশচন্দ্র বাবু তার স্ত্রী লীলাবতী দাস, ছেলে গৌতম, মনজু ও বাপ্পা এবং আরো কয়েকজনকে নিয়ে সিলেট থেকে ট্রেন ধরলেন | ট্রেনে মাল উঠাতে গিয়ে কিছু মাল বাদ পরল | অতএব ছেলে গৌতমকে রয়ে যেতে হলো পরদিন বাকি মাল নিয়ে আসার জন্য | সেদিন ট্রেনে একমাত্র জ্যোতিষ বাবুদের কামরাটি ছাড়া, বাকি কামরাগুলো মিলিটারিদের জন্য রিজার্ভ করা ছিল | যতীশবাবুদের কামরার ৬০ যাত্রীর মধ্যে, সকলেই মুসলিম কেবল যতীশবাবুরা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অবিনাশ ভট্টাচার্য, তার স্ত্রী ও তিন বছরের মেয়ে বাদে | ট্রেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া এসে পৌছালো, প্লাটফর্মে উল্টোদিক থেকে ঢাকা থেকেও আরেকটা ট্রেন এসে পৌঁছলো | দুটো ট্রেন পাশাপাশি দাঁড়ালো | যতীশবাবুর স্ত্রী লীলা দেবীর চোখ পরলো পাশে দাঁড়ানো ট্রেনটার একটা কামরার দিকে | কামরাটা রক্তে ভেজা | এ কি ভয়ানক দৃশ্য ! লীলা দেবী আঁতকে উঠলেন | ওই ট্রেনের এক মুসলিম যুবককে নীলা দেবী প্রশ্ন করলেন ব্যাপারটা কি ? যুবকটি হাত নেড়ে ইশারায় লীলা দেবীদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশনে নেমে যেতে বলল় | বিপদের সংকেত পেয়ে যতীশবাবুরা ট্রেন থেকে নামার চেষ্টা করলেন, কিন্তু নামবেন কি করে, কামরার মুখ ঠাসাঠাসি যাত্রীভর্তি ! এদিকে ট্রেন চলতে শুরু করে দিল, হিন্দু যাত্রীদের ভয়ে রক্তশূন্য অবস্থা | এইবার আস্তে আস্তে করে ট্রেন দেখতে দেখতে তালসহরে এসে পরলো | আনসারের পোশাক পরিহিত দুজন মুসলিম যুবক কামরায় উঠলো | ট্রেন স্টেশন ছাড়ার সাথে সাথে, দুই যুবক অবিনাশবাবুর উপরে ঝাপিয়ে পরলো, অবিনাশবাবু স্ত্রী কেঁদে উঠলেন, মেয়েটাও কাঁদছে | যুবক দুজন চলন্ত ট্রেন থেকে অবিনাশবাবুকে ছুড়ে ফেলে দিল | সাথে সাথেই ভাবলেশহীনভাবে শ্রীমতি ভট্টাচার্যের গয়নাপত্র লুঠ করতে থাকলো | তাদের কান্নায় কেউ কর্ণপাত করলো না | এদিকে যতীশবাবুর পরিবার এইসব দেখে ভয়ে আধমরা ! এই দৃশ্য দেখে কয়েকজন মুসলিম মহিলাও ভয়ে কেঁদে উঠেছিল | বাঙালি মুসলমান পুরুষরা আশ্বাস দিল :’ মুসলমানদের কোন ভয় নেই’! আর সঙ্গে সঙ্গে আরো কিছু বাঙালি মুসলমান চেঁচিয়ে বলে উঠলো: ‘ আরে ভাই এদিকেও আছে এদিকেও আছে !’ এইবারে পালা এলো যতীশবাবুদের | লীলাবতী দেবী কেঁদে অনুরোধ করলেন:’ আমাদের যা আছে নিয়ে নাও কিন্তু আমাদের মেরো না’! কে কার কথা শোনে ! যতীশবাবুকে প্রচণ্ড পিটিয়ে ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়া হল | ফেলে দেওয়ার আগে অনুরোধ করেছিলেন:’ আমি পাকিস্তানি আমাকে মেরোনা |’ ১৪ বছরের ছেলে বাপ্পাকে মেরে ট্রেনের বাইরে নিক্ষেপ করা হল, মনজুর উপরে চলল অকথ্য অত্যাচার, মনজু সিটের পায়া ধরে পরেছিল | এগুলো যখন চলছে তখন বাকি মুসলমান যাত্রীরা ‘আল্লাহু আকবর’ বলে চেচাচ্ছিল ! মনজুকে ফেলতে একটু দেরী হয়ে গেল, ট্রেন চলে এলো আশুগঞ্জ | মুসলমান হামলাকারী ট্রেন থেকে নেমে গেল | ট্রেন মাত্র এক মিনিট মত থেমেছিল তাই আবারও কেউ উঠে আসতে পারল না | ট্রেনপথের মাঝখানে অজ্ঞান হয়ে পরে রইলেন যতীশবাবু ও তার ছেলে বাপ্পা, ট্রেনের কামরায় রক্তাক্ত আধমরা মনজু ! ভৈরব বাজার স্টেশনে নেমে লীলা দেবী রেল পুলিশের দারোগাকে পাগলের মত অনুরোধ করলেন তার স্বামী ও ছেলেকে খুজে এনে দেবার জন্য | কেউ ওনার অনুরোধে একটুকু কান দিল না | অবশেষে লীলা দেবী, দুজন পুলিশের নজরদারিতে রাত্রিবেলা কিশোরগঞ্জ স্টেশনে পৌঁছেছিলেন |

সত্যি ভারী মানবিক ছিল সেদিনের বাঙালি মুসলমান, যার ঝলক আজও আমরা মাঝে মাঝে পাই | এগুলো যে ঘটবে, বা ঘটতে চলেছে, সংসার জীবনে বিচক্ষণ আমার ঠাকুমা সেদিনের পূর্ব পাকিস্তানের সামাজিক হালচালে বেশ কিছুটা টের পেয়েছিলেন, র তাই বুকে পাথর রেখে পরিবারসহ জন্মভূমি ত্যাগ করেছিলেন | নিঃশব্দে এই মানুষগুলোর দেশত্যাগ অবশ্য বাঙালী মুসলমানের মধ্যে কোন অনুশোচনা, বা অনুতাপের সঞ্চার ঘটায়নি ! তবে সময় বদলেছে, স্বল্প হলেও মানসিকতা পাল্টেছে, আর তাই হিন্দুদের এই নিঃশব্দ জন্মভূমি ত্যাগ নিয়ে বেশকিছু ওপার বাংলার মানুষ সরব |